রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদইন্টারভিউকাল ঈদুল আজহা

কাল ঈদুল আজহা

ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আগামীকাল। ইসলামে মহাত্ম ও বরকতপূর্ণ দিনসমূহের মধ্যে এ দিনের তাৎপর্য অপরিসীম। আরবী ‘কোরবান’ থেকে কোরবানি শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। পশু কোরবানির মাধ্যমে এ দিনে  মুমিন বান্দা আত্মত্যাগ করত: আল্লাহর নৈকট্য লাভে  অগ্রসর হয়। ফলে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে দ্বীনি আমেজে প্রাণস্পন্দন জেগে উঠে। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির গভীর বন্ধনে শান্তির সুবাতাস বয়ে যায়। ঈদের জমায়েতে পারস্পরিক সালাম, কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ে অকৃত্রিম আত্মীয়তা জমে উঠে। সমাজের দীনহীন অনাথ এতিম ও হতাশশ্রেণী একদিনের জন্য হলেও নিজেদের অধিকার ফিরে পায়। অমলিন হৃদয়ে হাসিমুখে একে অপরের সাথে মিলিত হয়। সবাই সাম্যবাদের মর্মকথা হরহামেশা উচ্চারণ করলেও ঈদুল আজহা বা কোরবানির দিন তার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠে। কোরআন হাদীসের অসংখ্য জায়গায় কোরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। আল্লাহ রাববুল আলামীন কুরআনে পাকের সবচে’ ছোট সূরা সূরায়ে আল কাওছারে ফরমায়েছেন ‘অতএব তুমি তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং কোরবানি কর।’ কোরবানি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবুল হয় না। নিবেদিত প্রাণ, গভীর আন্তরিকতা ও ইসলামী শরীয়তের প্রতি অগাধ আস্থা সহকারে কোরবানি পেশ করতে হবে।
পৃথিবীতে ধর্মকর্মের ইতিহাস যত প্রাচীন কোরবানির ইতিহাসও তেমনি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মানব জাতির জন্য আল্লাহ পাকের তরফ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে প্রত্যেক শরীয়তে কোরবানির হকুম বিদ্যমান ছিল। সকল উম্মতের এ ছিল ইবাদতের এক অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির এক রীতিনীতি নির্ধারণ করেছি যেন তারা ঐ সব পশুর উপর আল্লাহ পাকের নাম নিতে পারে যেসব তিনি তাদেরকে দান করেছেন।’ ( সূরা হজ -৩৪)
কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়,আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর সন্তান হাবিল ও কাবিল প্রথম কোরবানি করেন। তখনকার সময় প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান যমজ হিসেবে জন্মগ্রহণ করত এবং তারা পরস্পরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারত না। দেখা গেছে, হাবিলের সহোদর হিসেবে যে মেয়েটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে তা কাল ও বিশ্রী। আর কাবিলের সহোদর বোন খুবই রুপসী ও মায়াবতী। শরীয়তের বিধান অনুসারে কাবিলকে হাবিলের সহজাত বোন আর হাবিলকে কাবিলের সহজাত বোন বিয়ে করতে হবে। এতে কাবিল রাজী না হওয়ায় বিবাদের সৃষ্টি হয়। অতঃপর উভয়ের পিতা হযরত আদম (আ.) হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার জন্য বললেন, ‘তোমরা উভয়ে সামর্থানুযায়ী আল্লাহ তা’য়ালার উদ্দেশ্যে কুরবানি পেশ কর।
যার কোরবানি কবুল হবে সে কাবিলের সহজাত বোন রুপ লাবণ্যে শ্রেষ্ঠ আকলিমাকে বিয়ে করতে পারবে’। এ ঘটনার সত্যায়নে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন ‘আর তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা শুনিয়ে দাও, যখন তারা দুই জনেই কোরবানি করলো, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো অপরজনের কোরবানি কবুল হলো না। (সূরা মায়েদা – ২৭)
আল কুরআনে হযরত ইবরাহীম (আ:)কে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে আর কোরবানি তারই অন্যতম সুন্নাত, আদর্শ। বর্তমানে আমাদের সমাজে যে কোরবানি প্রথা চালু আছে তার সাথে যে ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে তা আল কোরআনের সূরা আস্ সাফ্ফাতের ১০২-১১২ আয়াতে কারীমায় সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ‘‘যখন সে (ইসমাঈল আ:) তার সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছলো তখন একদিন ইব্রাহীম (আ.) তাকে বললো : প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যেন জবেহ করছি। বল দেখি কি করা যায়? পুত্র বিনা দ্বিধায় বললো, আববা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা শীঘ্রই পালন করুন। ইনশাল্লাহ, আপনি আমাকে অবিচল দেখতে পাবেন। অবশেষে পিতাপুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের সোপর্দ করলেন এবং ইবরাহীম (আ:) পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন (জবেহ করার জন্য )। তখন আমরা তাকে আহবান করে বললাম, ইবরাহীম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্ত্তত:এ এক সুস্পষ্ট অগ্নিপরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কোরবানি ফিদ্য়া স্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাঈল আ.) উদ্ধার করেছি। আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের জন্য ইবরাহীমের এ সুন্নাতকে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীম (আ.) এর উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে জীবনদানকারীদেরকে আমরা এ ধরনের প্রতিদানই দিয়ে থাকি। নিশ্চিত রূপে সে মুমিন বান্দাদের মধ্যে শামিল’।
তাফসীরে এসেছে, হযরত ইবরাহীম (আ.) তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে জবেহ করতে বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ মনোরথ হলে ছুরি হাত থেকে ফেলে দেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আ.) ঐশী প্রত্যাদেশে হযরত ইসমাঈল (আ.) এর বদলে কোরবানির জন্য একটি দুম্বা নিয়ে হাজির হলেন। এভাবে মুসলিম জাতির কাছে কোরবানি প্রথা অদ্যাবধি চলে আসছে।
কোরবানির দিন হজের দিনও। হজ ইসলামের ৫ম রুকন। ইসলাম গ্রহণ করার পর আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিকে অবশ্যই হজ পালন করতে হবে। জ্ঞানসম্পন্ন, সুস্থ, বয়োপ্রাপ্ত, স্বাধীন, চক্ষুষ্মান, ঋণমুক্ত, সংসারের যাবতীয় খরচ বাদে যে ব্যক্তি নিরাপদে পবিত্র মক্কায় হজ পালন করে ফিরে আসতে সক্ষম, তার উপর হজ ফরজ। যদিও সে মদিনায় যিয়ারতে অক্ষম হোক।  ইরশাদ হয়েছে ‘ তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ আদায় করো।’ ( বাকারা : ১৯৬) হজের  গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী সা. বলেছেন, ‘যার কোন প্রকাশ্য অসুবিধা নেই, কোন যালিম বাদশাও যার পথ রোধ করেনি এবং যাকে কোন রোগ অসমর্থ করে রাখেনি – এতদসত্ত্বেও সে যদি হজ না করেই মরে যায়, তবে সে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান হয়ে মরতে পারে।’ হযরত ওমর ফারুক রা. এর ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা হজ করে না, তাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে ইচ্ছা হয়। কারণ, তারা মুসলমান নয়, মুসলমান নয়।’যারা সহায় সম্বল থাকার পরও দুনিয়াবি ঝক্কি-ঝামেলায় বেশি ব্যস্ত থাকায় হজের জন্য সময় বের করতে পারছেন না, কাল কিয়ামতের ময়দানে তাকে কঠিন মাশুল দিতে হবে। তাই হজ ফরজ হলে তাড়াতাড়ি তা সমাপন করা উচিত। যাব যাব বলে সময় ক্ষেপন করলে পরে আর নাও যাওয়া হতে পারে। এ প্রসঙ্গে নবীজী বলেন, ‘হজ ইচ্ছা পোষনকারী যেন তাড়াতাড়ি তা সম্পাদন করে ফেলেন। কেননা তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, তার উট হারিয়ে যেতে পারে বা অন্য যে কোন কারণে তার ইচ্ছা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।’-(ইবনে মাজাহ)। যারা হজ পালনের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও পবিত্র হজ আদায়কে উপেক্ষা করে চলে তাদের ব্যাপারে  হাদীস শরীফে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসুল সা. বলেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালা যাকে হজ করার ক্ষমতা দান করেছিল, যদি সে হজ না করে মৃত্যুবরণ করে তবে সে দোজখে ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক আগুনে পতিত হবে।’ কুরআন হাদীসের অসংখ্য জায়গায় হজের  বহু ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করেছে এবং হজের কার্যাবলী আদায়কালে কোন প্রকার অশ্লীল কথা এবং কোন গুনাহের কাজ করেনি, সে যেন নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করলো – (বুখারী-মুসলিম)। আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান ও ইখলাসের সাথে কোরবানি প্রদান ও হজ ফরজ হয়ে থাকলে তা দ্রুত আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ