ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
রাজধানীতে কিছুদিন ধরে বেড়েই চলছে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম। ছিনতাইকারী চক্রটি প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে যাচ্ছে বড় বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা। কিন্তু তারা রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
সোমবার সকালে রাজধানীর উত্তরায় নিজ অফিসের সামনে গাড়ি পরিস্কার করছিলেন চালক মফিজুর রহমান। এ সময় হটাৎ করে একটি গাড়ি থেকে ৩/৪ জন যুব নেমে কিছু বুঝে উঠার আগেই তার কাছ থেকে গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। মফিজ তাকেরকে বাধা দিলে ৪ যুবক উপর্যুপরি কোপাতে থাকে মফিজুরকে। এক পর্যায়ে তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গাড়ি নিয়ে দাপটের সঙ্গে চলে যায় ছিনতাইকারীরা।
এর একদিন আগে শনিবার দুপুরে ওমর ফারুক রুবেল নামের এক ব্যবসায়ী তিনি তার বোনকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য শ্যামলী কলেজ গেট এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন। হটাৎ করে মোটরসাইকেল করে ৩ জন যুবক এসে তার বোন আনিতা ইসলাম বিথির ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে চলে যায়।
রুবেল জানান, তার বোনের ব্যাগের ভেতরে ব্যবসার ৩০ হাজার টাকাসহ বেশ কিছু গুরুত্বর্পূণ কাগজপত্র ছিলো। একই দিন ধানমন্ডিতে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর ৮০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।
ছিনতাইয়ের এটি দুই দিনের হিসাব। গত সপ্তাহ জুড়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় অর্ধ শতাধিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এতে করে বোঝা যায় রাজধানীতে হটাৎ করে আবারো বেড়ে গেছে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা । বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এ চক্রটি। প্রায় প্রতিদিন এদের কবলে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এতে করে যেমন সাধারণ মানুষরা আহত বা নিহত হচ্ছেন, তেমনি টাকা মোবাইলসহ অন্যান্য মালামাল হারাচ্ছেন।
তবে পুলিশ বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রেখেছেন। ছিনতাই রোধে ইতিমধ্যে রাতে পুলিশ টহলও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে সকল এলাকাতে ছিনতাই হয় সে সকল এলাকাগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ৩ শতাধিকের ওপরে ছিনতাইয়ের স্পট গড়ে উঠেছে। এ স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে পেশাদার ছিনতাইকারীর পাশাপাশি উঠতি বয়সের ছেলেরা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল করে উঠতি বয়সের ছিনতাইকারীরা বেপরোয়াভাবে রাস্তাঘাটে ছিনতাই করে চলেছে। মোটরসাইকেলে করে দ্রুত গতিতে চলে যাওয়ার কারণে এরা সহজেই ধরাও পড়ছে না।
রাজধানীর যে সকল স্থানে বেশিরভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- মালিবাগের সিআইডি অফিসের সামনে থেকে কাকরাইল মোড়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ১ নম্বর গেট থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের আগে পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত, শান্তিনগর মোড় থেকে ইস্টার্ন প্লাজা মার্কেট, মিরপুর-১ নম্বর গোলচত্বর থেকে টেকনিক্যাল মোড়, মহাখালী বাস স্ট্যান্ড থেকে গুলশান শুটিং ক্লাব, মহাখালী কাঁচাবাজার, পান্থপথ মোড় থেকে ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে কাজলার পাড়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে জনপথ মোড় হয়ে ধলপুর সিটি পল্লী, উত্তরার জসীম উদ্দীন রোড, মেরুল বাড্ডা থেকে রামপুরা ব্রিজ, মৌচাক থেকে মগবাজার মোড়, জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও মোড় থেকে শ্যামলী শিশুমেলা, আগারগাঁও মোড় থেকে তালতলা বাসস্ট্যান্ড, বাড্ডা নতুনবাজার ও কল্যাণপুর বাজার থেকে শ্যামলী ক্রসিং, গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া, বাবুবাজার ও হাতিরঝিল
তবে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর স্পট হচ্ছে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরের বাউন্ডারি ঘেরা সংরক্ষিত এলাকা। সন্ধ্যার পর থেকে এটি ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। এর পাশাপাশি দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর কবরস্থান রোড, যাত্রাবাড়ী মৎস্য আড়তের আশপাশ, মানিকনগর, মীরহাজীরবাগ ঘুণ্টিঘর, জুরাইন বালুর মাঠ, পশ্চিম ধোলাইরপাড়, কদমতলী ওয়াসা রোড, শ্যামপুর থানার পেছনে, নামা শ্যামপুর, কল্যাণপুর হাউজিং এস্টেটের পাশের সড়ক, রাইনখোলার হাজী রোডসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ছিনতাই হয়।
গত সপ্তাহে ছিনতাইয়ের চিত্রে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ৫জন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। এদের মধ্যে একজনের নগদ ৩৫ হাজার টাকাসহ মোটরসাইকেল ছিনতাই। ওই দিন সকালে মহাখালীর ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মোটরসাইকেল খোয়ান আব্দুর রউফ নামের এক কলেজ ছাত্র। আগের দিন বুধবার শাহবাগের আজিজ মার্কেটের সামনে রাত আড়াইটার দিকে জাতীয় পার্টির লালবাগ থানার সহ-সভাপতি রাজেশ গণিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ নগদ ৩৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন সেট ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এছাড়া একই রাতে শ্যামপুরে জুয়েল নামের এক যুবককে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে ৩ হাজার ২শ টাকা ও মোবাইল সেট ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
গত মঙ্গলবার কামরাঙ্গীরচরের আলিনগরের পলিথিন ব্যবসায়ী ফিরোজ মিয়াকে ছুরিকাঘাত করে ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।
গত ২৩ জুলাই মিরপুর শেরেবাংলা নগর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশে রিপন মিয়া নামে ৠাবের এক ডিএডি ছিনতাইকারীদের গুলিতে আহত হয়েছেন। ১৬ জুলাই দুপুরে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে জাফর নামের এক ৠাব সদস্যকে গুলি করে তার কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা।
হটাৎ করে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাতের বেলায় রাজধানী ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিনত হচ্ছে। রাতে পুলিশ টহল থাকার পরও পুরো রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। প্রতিদিন রাতে তাদের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে কাউকে জীবনও দিতে হচ্ছে।
উত্তরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদৎ হোসেন বলেন, আমরা রাতে টহলরত পুলিশদের সতর্ক করে দেই, রাতে যেন ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা না ঘটে। পাশাপাশি ছিনতাই রোধে টহল জোরদার করা হয়েছে।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অপূর্ব হাসান বলেন, পুরো এলাকাজুড়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থায় থাকে। এরপরও কিছু কিছু এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে থাকে। আমরা সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।
ডেমরা জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ডেমরা জোনের পুরো এলাকায় পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্কতায় থাকে। সবকিছুই আমরা নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি।
ডিএমপির সদর দফতরের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) আনোয়ার হোসেন বলেন, শুধু ছিনতাই নয়, কোনো অপরাধ যেন সংঘটিত হতে না পারে সে ব্যাপারে রাজধানীর প্রত্যেকটি থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে সকল এলাকায় বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে সে সকল এলাকাগুলোতে পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।




