শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়শারদীয় দুর্গোৎসব : সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হোক

শারদীয় দুর্গোৎসব : সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হোক

শনিবার শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমী। মহাষ্টমীর দিন সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটের মধ্যে সারা বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার মন্দিরে দুর্গাদেবীর যথাবিহিত পূজা শুরু হয়ে সকাল ১০টায় শেষ হয়।  মহাষ্টমীর ব্রতোপবাস পালন করা হয়। বিকেল ৪টা ১৮ মিনিট থেকে ৫টা ৬ মিনিটের মধ্যে সন্ধিপূজা সমাপন হয়। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধি পূজা অনুষ্ঠিত হয় ৩টা ৩৩ মিনিট থেকে ৪টা ২১ মিনিটের মধ্যে।  দুপুরে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসেন বাংলাদেশে ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনার সন্দীপ চক্রবর্তী। তিনি দেবী প্রণাম শেষে মন্দির চত্বর ঘুরে দেখেন।

এদিন মহাষ্টমীর মূল আকর্ষণ ছিল কুমারী পূজা। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন রামকৃষ্ণ মিশনসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

কুমারী পূজার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সব নারীতে মাতৃরূপ উপলব্ধি করা। সকালে নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। ফুলের মালা চন্দন ও নানা অলংকার-প্রসাধন উপাচারে নিপুণ সাজে সাজানো কুমারীকে পূজা দেওয়া হয়।

এদিকে, সন্ধ্যার শুরুতেই রাজধানীর পূজামণ্ডপগুলোতে ভিড় বেড়েই চলেছে। দুপুরে হঠাৎ নামা বৃষ্টি উপেক্ষা করে দর্শনার্থী ও পূণ্যার্থীদের ভিড় বেড়ে যায়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঈদ ও পূজায় বন্ধ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষকরা সন্ধ্যায় পূজা মণ্ডবে আসেন। সন্ধ্যার পর মণ্ডপগুলো আলোকসজ্জা করা হয়। ঢাকার মণ্ডপগুলোর মধ্যে ঢাকেশ্বরী, রামকৃষ্ণ, সিদ্ধেশ্বরী মণ্ডপে ভক্তদের ঢল ছিল ব্যাপক। সারাদেশে এবার ২৯ হাজারেরও বেশি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরে এ বছর গতবারের চেয়ে ১২টি বেড়ে মোট পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২১২টি। শনিবার পূজাশেষে অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ-আরতির আয়োজন ছিল।

আগামীকাল বিজয়া দশমী, শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন। এ দিনে ভক্তদের মন সিক্ত হয় দেবী দুর্গার বিদায়লগ্নের আনন্দ-বেদনার মিশ্রিত অনুভূতিতে। বাঙালি হিন্দুসমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের এই শুভক্ষণে আমরা সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গা দেবীর স্থান ও মর্যাদা পরম ভক্তিময়। এই দেবীর এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। পুরাণ বলে, তিনি অশুভর প্রতীক অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর এই জয়ের মধ্য দিয়ে অন্যায়-অশুভর বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই থেকে হিন্দুসমাজের উচ্চ অংশে তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধার হিসেবেই বিবেচিত হন না, তিনি অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় বলেও গণ্য হন। মানবকুলের জন্য তিনি বহন করে আনেন মঙ্গলবার্তা। যেকোনো ধর্মের পরম প্রতীকের গুরুত্ব এখানেই যে তা সব মানুষের মধ্যেই শুভবোধের সঞ্চার ঘটাতে সক্ষম। এটাই ধর্মীয় প্রতীকের সর্বজনীন তাৎপর্য।
শারদীয় দুর্গাপূজা কেবল আরাধনার উপলক্ষই নয়, তা আনন্দ-মিলনের সুযোগও। এবং সেই আনন্দ ধর্মসম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের সবাইকে আবাহন করে, কাছে ডেকে নেয়। দুর্গোৎসব তাই দিনে দিনে হয়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। কেবল বাংলাদেশ বা ভারতেরই নয়, সারা পৃথিবীর বাঙালি হিন্দুরা এই উৎসবকে তাঁদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি কেন্দ্রীয় উৎসব হিসেবে দেখে থাকেন।
আদিতে কেবল বনেদি জমিদার বাড়ির উৎসব হয়ে থাকলেও কালক্রমে দুর্গোৎসবের আকর্ষণ বর্ণ-নির্বিশেষে হিন্দুসমাজের সব অংশেই ছড়িয়ে গেছে। এ উৎসবে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ প্রতিবেশীর মধ্যে শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির আদান-প্রদানও অনেক বেশি ঘটে। এর মাধ্যমে ফুটে ওঠে বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সর্বপ্রাণবাদ, নারী তথা মাতৃচরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এই গুণাবলি যতটা ধর্মের বিশ্বাস, ততটাই সংস্কৃতির প্রাণরসও।
সামনে নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানা শঙ্কা-অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। এসব সত্ত্বেও দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সারা দেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে স্বাভাবিক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সম্প্রীতির পরিবেশে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপগুলোতে যথারীতি বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের নারী-শিশুসহ সব বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। এই শান্তি-সম্প্রীতি ও যথাযথ উৎসবমুখর পরিবেশেই যেন দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে, এটা আমাদের সবার কামনা। আশা করি, প্রশাসনও এ বিষয়ে সজাগ-সতর্ক রয়েছে।
দুর্গোৎসবে সব ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের মিলিত আনন্দ আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সংহতিরও প্রকাশ। প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব এভাবে শান্তি ও সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে উদ্যাপিত হবে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মানুষে মানুষে সব বিভেদ ও সংকীর্ণতা চিরতরে দূর হয়ে যাক, মিলন ও সম্প্রীতির ধারা শক্তিশালী হোক। সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির বিজয় হোক—বিজয়া দশমীতে এটাই আমাদের আন্তরিক কামনা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ