ঈদের পর কোমর বেধেই আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেকে আবারো আপোষহীন প্রমাণ করে ঘরে ফিরতে চান জিয়াপত্নী।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে কঠোর আন্দোলন করা হবে বলে রমজানে ইফতার পার্টিসহ অন্যান্য সভায় বলেছেন বিএনপি নেতারাও।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় না বসে এবং সরকার পতনের দাবিতে রাজপথে কঠোর আন্দোলন করে নিজেকে ‘আপোষহীন’ হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন খালেদা জিয়া।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের পথে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের চারটি নির্বাচনের ফলাফল হয়েছিল বি-এ-বি-এ ফরমেটে। সে ফরমেটে চিন্তা করলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদাকে আবারো হাতছানি দিচ্ছে ক্ষমতার মসনদ। সরকারের শেষ সময়ে এসে ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মাঠে ৫ গোল দিয়ে ধরাশায়ী করেছেন প্রতিপক্ষ সরকারি দলের নেত্রীকে। তাইতো চাঙ্গা মনোবল নিয়ে এবার সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন স্বয়ং ১৮ দলীয় জোট প্রধান খালেদা জিয়া।
সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকেই তা পুর্নবহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বিরোধী দল। এ দাবি না মানলে সরকারকে ‘কানা-খোঁড়া’ করে পথে নামাবেন বলে অনেক আগেই হুমকি দিয়েছিলেন খালেদা। নির্বাচনে বিজয়ের ফরমেট আর সাম্প্রতিক সাফল্য যখন পক্ষে তখন ঈদের পর চূড়ান্ত আন্দোলনে রাজপথে নেমে সাফল্য ছিনিয়ে আনবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
নিজেদের অধীনে সরকারের নিবার্চনের প্রস্তুতিকে পাতানো খেলার প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছে বিএনপি। তাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আগস্ট মাস থেকে হরতাল অবরোধ, সভা-সমাবেশ ও ঢাকাসহ সারাদেশের বিভাগীয় শহরে জনসভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এসব জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে খালেদা জিয়ার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জনসভাগুলোতে সরকারের সমালোচনার মধ্য দিয়ে মূলত দুটি টার্গেটে বক্তব্য দেবেন বিএনপি নেত্রী। তার টার্গেট থাকবে, জনগণের সমর্থন নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সরকার হিসেবে বিএনপিকে নির্বাচিত করা।
দেশের রাজনীতিতে আগস্ট মাসটি ভাঙ্গা-গড়ার মাস হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ মাসের আন্দোলনকে সরকার আমলে না নিলে কঠোর আন্দোলন হিসেবে লাগাতার কর্মসূচির চিন্তাও করছে বিরোধী দল বিএনপি।
বিএনপি সূত্রের দাবি, ঈদ উৎসব পরবর্তী আন্দোলনকে জোরদার করতে রমজান মাসটাকে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। আন্দোলনকে সফল করতে ১৮ দলীয় জোট ছাড়াও অন্যান্য ছোট ছোট রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমর্থন তাদের পক্ষে টানতে সম্প্রসারিত করেছেন দু’হাত। ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে খালেদা আন্দোলনের সমর্থন বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন বলেও দাবি করেছে সূত্রগুলো।
এদিকে বিএনপি গত তিন মাস ধরে সারাদেশের মাঠ পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দলটির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলায় ৩৮টি টিম কাজ করছে। এ সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে খালেদা তার আপোষহীনতার তকমা আবারো সফল করতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাজধানী থেকে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করতেই রাজধানী ও তার পাশের জেলাগুলোর নেতাদের নিয়ে দলীয় প্রধানের নির্দেশে এ কার্যক্রম চালান তিনি। কুড়িগ্রাম, মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় সভা করেছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদও।
গত মে মাসে রাজধানীর শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে নিয়ে খুব দ্রুতই পট পরিবর্তন করে দিতে চেয়েছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। সেদিনই ঢাকাবাসীকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি ক্ষমতায় যেতে হেফাজতের আশীর্বাদ নেওয়ারও চেষ্টা চালান। ইতিমধ্যে সিটি নির্বাচনগুলোতেও কওমি মাদ্রাসা নির্ভর এ গোষ্ঠীর বেশ সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
ধর্মকে ব্যবহার করে সরকারকে বিপর্যস্ত করতে এবং আন্দোলনকে আরো জোরালো করতে অন্য রাজনৈতিক দল ছাড়াও যথাসম্ভব ধর্মীয় সংগঠনকেও কাজে লাগানোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে দলটি।
হেফাজত ছাড়াও তাই কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা।
খালেদার নির্দেশে রমজান মাসে সারাদেশে গণসংযোগ ও পথসভা করছেন ছাত্রদল নেতারা। জেলা ও উপজেলায় জনসমর্থন বাড়াতে ইফতার মাহফিলও করেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠনটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বাংলানিউজকে জানান, আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে দলটির স্থায়ী কমিটি ও ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বসবেন খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে সরকারকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মানাতে ও পতনের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনের রূপরেখা প্রস্তুত করবেন তিনি।
আগস্ট মাসে হরতাল, রাজপথ অবরোধ, ঘেরাও এবং রাজধানী ঢাকাসহ ৬ বিভাগীয় শহরে জনসভা করার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ওই নেতা।
তিনি বলেন, এ আন্দোলনের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিষয়টিও যোগ হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে আরপিও সংশোধন করায় নিবার্চন কমিশনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে ১৮ দল।
আন্দোলনের ব্যাপারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি বলেছেন, সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানাতে আগস্ট মাসের শেষ দিকে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে।
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। এখন নরম থাকলেও এ আন্দোলন ঈদের পরে গরম হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অসুস্থ রাজনীতির চর্চা ও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস দেশের রাজনীতিতে হাসিনা-খালেদা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ করে তুলেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে দু’নেত্রীই নিজেদের অবস্থানে অনড়। আর এ পরিস্থিতিতে ঈদের পরে রাজপথে প্রতিপক্ষকে এক হাত দেখে নিতে বেশ জোরালো প্রস্তুতিই নিয়েছেন খালেদা জিয়া।




