ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
বিএনপিবিহীন দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
তিনি বলেছেন, “আমি নির্বাচন বর্জনকারী দলসমূহকে অনুরোধ করব, সংঘাত ও নৈরাজ্যের পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসুন। “সরকারের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে ঐকমত্যে এসে গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে সাহায্য করুন।”
সংবিধান অনুযায়ী বুধবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। সংসদ নেতা শেখ হাসিনাও অধিবেশনে ছিলেন, ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদও। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদকে ‘অবৈধ’ বলে আসছে ভোট বর্জনকারী বিএনপি।
তাদের আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ এবং সহিংসতা ছাড়লে আলোচনার মধ্য দিয়ে সমঝোতা হলে আগাম নির্বাচন হতে পারে। রাষ্ট্রপতির ভাষণেও ছিল একই সুর- “সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সংশ্রব ত্যাগ করে উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করুন।”
“রাজনীতি থেকে হিংসা, হানাহানি ও সংঘাতের অবসানের মাধ্যমে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখুন,” ভোট বর্জনকারী দলগুলোর উদ্দেশে বলেন তিনি। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাবে বিরোধী দলের সাড়া ‘না’ দেয়ার সমালোচনাও আসে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে।
“বিরোধী দলকে সর্বদলীয় সরকারে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এমনকি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবে তারা যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী, সে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদানেরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু বিরোধী দল সে আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার পথ বেছে নেয়।”
বিএনপিবিহীন নির্বাচন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, “সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচন প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।”
ভোট বর্জনের ডাক দিয়ে সহিংসতা এবং নির্বাচন পরবর্তী হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার সমালোচনাও করেন আবদুল হামিদ। “রাজনীতির নামে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির এ ধরণের অপচেষ্টা দমন করতে হবে। জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে,” সরকারের উদ্দেশে বলেন তিনি।
ভাষণে রাষ্ট্রপতি গত পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার মহাজোট সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে তার প্রশংসা করেন, সমালোচনা করেন বিএনপির সংসদ বর্জনের। “কোনো কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের দায়িত্বহীন আচরণ দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে বার বার বাধাগ্রস্ত করেছে।”
যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একাত্তরের চেতনা পুনরুজ্জীবনের ‘মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুল হামিদ। এই বিচার করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ার বিষয়টিও আসে রাষ্ট্রপতির ভাষণে।
“মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ২০০৯ সালে কতিপয় বিরোধী রাজনৈতিক দল অসহযোগিতা ও সংঘাতের পথ গ্রহণ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠে।”
১৮ পৃষ্ঠার লিখিত ভাষণে রাষ্ট্রপতি দেশের উন্নয়নের চিত্রও তুলে ধরেন। ভাষণের সংক্ষিপ্তসার সংসদে পড়েন তিনি, এতে সময় নেন ৪১ মিনিট।
এর আগে ২০০১ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ সংসদে ২ ঘণ্টা ৯ মিনিট ভাষণ দেন, যা সংসদে কোনো রাষ্ট্রপতির দেয়া সর্বোচ্চ সময়ের ভাষণ। আর সবচেয়ে কম সময় ভাষণ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি মাত্র ৯ মিনিট ভাষণ দেন।
আবদুল হামিদ বক্তব্যের শুরুতে দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান, অভিনন্দন জানান ভোটার তথা দেশবাসীকে।
“এই প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থেকে সংবিধান সমুন্নত রেখে আরেকটি নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব হস্তাহন্তর করেছে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল অর্জন।” গণতন্ত্র নস্যাতের যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরপরই সংসদ ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই অধিবেশনের প্রথমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। স্পিকার পদে শিরীন শারমিন চৌধুরী পুনর্নির্বাচিত হন, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ফজলে রাব্বী মিয়া। সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। এরপর শিরীন শারমিন সভাপতির আসন নেয়ার পর ভাষণ দেন তিনি।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে এবার প্রেসিডেন্ট প্লাজা দিয়ে সংসদে ঢোকেন আবদুল হামিদ। এর আগে সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রেসিডেন্ট প্লাজা দিয়ে সংসদে ঢুকেছিলেন।



