বাংলাদেশের দুর্ঘটনাকবলিত দু’টি পোশাক কারখানার হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে জেনেভায় পশ্চিমা ক্রেতা ও প্রেসার গুপগুলোর দু’দিনব্যাপী বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে।
বৈঠকটির আয়োজকরা গতরাতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশি পোশাকের যেসব ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। আর যারা অংশ নিয়েছেন তারা এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত আসতে পারেননি।
বৈঠকে তাজরিন ফ্যাশনস নামের একটি পোশাক কারখানায় আগুন এবং রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হতভাগ্য শ্রমিকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়সহ বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
গত বছরের নভেম্বরের শেষের দিকে ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনসের পোশাক কারখানায় আগুনে ১১০ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় অন্তত ১,২০০ শ্রমিক নিহত এবং আড়াই হাজার শ্রমিক আহত হন। ট্রেড ইউনিয়নগুলো বলছে, তাজরিন ফ্যাশনস এবং রানা প্লাজায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যে সব শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবার-পরিজন এখন বেঁচে থাকার দুঃসহ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
গত এপ্রিলে রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর নিরীহ শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমাজের দৃষ্টিতে আসে। পশ্চিমা ক্রেতারা বাংলাদেশের প্রায় ৪,৫০০ পোশাক কারখানা থেকে নামমাত্র দামে পণ্য কিনলেও কখনোই মালিকদের কাছে একথা জিজ্ঞাসা করেনি যে, এত কম দামে কীভাবে পোশাক তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন, তাদের রক্তচোষা টাকা দিয়ে মালিক এবং পশ্চিমা ক্রেতারা ফুলেফেঁপে উঠলে তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের দাবি, বেতন-ভাতা বাড়ানো না হোক, অন্তত কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি মজবুত করা হোক যাতে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তাদের কাজ না করতে হয়।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের রক্তচোষা পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়ালমার্ট, বেনেটন ও ম্যাংগো। মানবাধিকারের ধ্বজাধারী পশ্চিমা দেশগুলোর এসব কোম্পানি জেনেভা বৈঠকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়ার ভদ্রতাটকু দেখানোরও প্রয়োজন মনে করেনি।
জেনেভা বৈঠকে একমাত্র প্রিমার্ক সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে। এটি বলেছে, তারা আরো তিনমাস রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পরিবারবর্গকে মাসিক বেতন দিয়ে যাবে। বুধ ও বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকটিতে যে ১১টি কোম্পানি অংশ নেয় তাদের প্রায় সবাই ইউরোপীয়। আমেরিকা বা কানাডার কোন প্রতিষ্ঠান এতে যোগ দেয়নি।
বৈঠকটির আয়োজকদের মুখপাত্র ইনেকে জেডেনরাস্ট বৃহস্পতিবার রাতে জেনেভায় হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, তারা কোন সুনির্দিষ্ট অর্থ (ক্ষতিপূরণ বাবদ) দিতে সম্মত না হওয়ায় আমরা হতাশ। (বৈঠকটি থেকে) আমাদের আরো বেশি আশা ছিল।
আয়োজকরা বলেছিলেন, শুধুমাত্র রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে সাত কোটি ৪৫ লাখ ডলারের সমপরিণাম অর্থ প্রয়োজন। সেইসঙ্গে তাজরিন ফ্যাশন্সের আগুনে নিহত ১১২ শ্রমিকের পরিবারবর্গের জন্য প্রয়োজন আরো ৬৪ লাখ ডলার।
তবে জেনেভা বৈঠকের আয়োজকরা এখনো হাল ছাড়েননি। তারা বলেছেন, দু’সপ্তাহ পর আবার ক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার চেষ্টা করবেন তারা। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে যারা স্বীকৃতি দিতে নারাজ তাদেরকে আবার একত্রিত করার চেষ্টায় আয়োজকরা কতখানি সফল হবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।




