ষ্টাফরিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
‘আমার কাছে তথ্য আছে, আগামীতে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসবে’- এমন মন্তব্য করে দেশের রাজনীতির মাঠে নিজের আবির্ভাব বেশ ভালোভাবেই জানান দিলেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তবে গত মঙ্গলবার যুবলীগের ইফতার মাহফিলে জয়ের এ মন্তব্যের পর আলোচনা-সমালোচনা চলছে সবখানে।প্রধান বিরোধী দল এই মন্তব্যকে দেখছে ষড়যন্ত্র হিসেবে। আর আওয়ামী লীগ দেখছে দলে জয়ের পদচারণায় নতুন প্রাণচাঞ্চল্যতা হিসেবে।একদিকে জয়ের আবির্ভাব ও বক্তব্যে আওয়ামী লীগে প্রাণচাঞ্চল্যতা সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বিএনপিতে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। আর বিএনপিতে জয়কে নিয়ে শঙ্কার প্রধান কারণ তারেকের অনুপস্থিতিতে জয়ই সবার মন জয় করেন কি না।ন্যূনতম রাজনৈতিক জ্ঞান যদি কারো মধ্যে থাকে, তবে এদেশের মূলধারার রাজনীতিতে সজীব ওয়াজেদ জয়ের আবির্ভাব ঘটবে এটাই তারা স্বাভাবিক বলে ধরে নেবেন। কারণ, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কাণ্ডারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র জয়। পাশাপাশি তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী সমর্থকদের আশার কারণ, তিনি বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি বড় মেয়ে ও দুই বারের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র।নানার সূত্রে দেশ পরিচালনা বা রাজনীতি করার ইতিহাস কিন্তু এই অঞ্চলে জয়ের ক্ষেত্রে একমাত্র উদাহরণই নয়। সেই নবাব সিরাজ-উদ্ দৌলাও বাংলার নবাব হয়েছিলেন নানার উত্তরাধিকার সূত্রেই। আবার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের প্রধান নির্বাচিত হয়ে আসছে একই রীতিতে। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে হিসেবে যেমন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেছেন, ঠিক জওহর লাল নেহেরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীও একইভাবে কংগ্রেসের হাল ধরেছিলেন।আবার নেহেরুর দৌহিত্র ও ইন্ধিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীও মায়ের মৃত্যুর পর কংগ্রেসের হাল ধরেন। আর এখন রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী, আর তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হবার পথে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন ইন্ধিরা গান্ধীর দৌহিত্র রাহুল গান্ধী। আর যোগ্য নেতা হিসেবেই কংগ্রেসের পরবর্তী প্রধানের পথে হাটছেন রাহুল গান্ধী।একই পদচারণা পাকিস্তানেও। পাকিস্তান পিপলস পার্টি-পিপিপি’র বর্তমান প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টোর নানা জুলফিকার আলী ভুট্টো আর মা বেনজির ভুট্টো। রাহুল গান্ধী যেমন তার গান্ধী উপাধি দাদী ইন্ধিরা গান্ধীর কাছ থেকে পাওয়া, তেমনি বিলাওয়াল ভুট্টোও তার শেষের পদবটি নানা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছ থেকেই পাওয়া।তবে এক্ষেত্রে জয়ের নামের সাথে নানার কোনো পদ অবশ্য যুক্ত নেই। তবে একইভাবে রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব হচ্ছেন তিনি। তাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী হিসেবেও তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই।কিন্তু দেশীয় রাজনৈতিক ময়দানে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পদচারণা সবে শুরু। ক’দিন আগে সস্ত্রীক দেশে আসার কারণ আগামী নির্বাচন বলে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন উঠেছে। আর এর ক’দিন বাদে গত মঙ্গলবারই আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তার মন্তব্য।তবে জীবনের অধিকাংশ সময় প্রবাসে থাকার কারণে দেশের রাজনীতির ভাষা বুঝতে জয়কে বেশ কষ্ট করতে হবে বলেই মনে করছেন অনেকে। যদিও উত্তরাধিকার রাজনীতির পথ অনেকটা সহজ করে দেবে।তবে দেশের রাজনীতি ও মানুষের ভাষা বুঝতে পারলে আগামীতে আওয়ামী লীগের কাণ্ডারী হতে জয়কে বেগ পেতে হবে না বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিএনপি ও জাতীয় রাজনীতিতে তারেক জিয়া একটি কলুষিত নাম হয়ে গেছে, তবে জয় এখনো পরিচ্ছন্ন। কারণ, রাজনীতি থেকে এতদিন দূরেই ছিল তার অবস্থান। দেশের মানুষের কাছে জয়ের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যদিও দেশের অনেক সাধারণ মানুষ এখনো পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর এই দৌহিত্রের নামটির সঙ্গে পরিচিত হননি, জানেন না তারা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ছেলের নাম।আগামী জাতীয় নির্বাচনের বাকি মাত্র কয়েক মাস। এরই মধ্যে জয় নিজের পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হবেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বিবার্তাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও শেখ হাসিনার পুত্র হিসেবে জয় এমনিতেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমরাও চাই জয় রাজনীতিতে আসুক।’তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগেও জয়ের গ্রহণযোগ্যতা যেমন রয়েছে, তেমনি সারা দেশেও জয়ের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সাধারণ জনগণ তাকে সাদরেই গ্রহণ করবে বলে বিশ্বাস আমাদের।’তবে, দেশের সাধারণ মানুষ জয়কে তারেক জিয়ার সঙ্গে তুলনায় ব্যস্ত। কারণ, ইতিমধ্যেই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠ হয়ে রাজনীতির মাঠে তারেক বেশ আগেই পরিচিত। বিএনপিতে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্ত। এমনকি বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তারেকই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে আলোচনায় উঠে আসছে। তবে দেশের রাজনীতিতে তারেক আবির্ভাবের পরপরই কলুষিত হয়ে পড়েছেন। হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক তার দুর্নীতি, চাঁদাবাজির খবর দেশের একটা শিশুও জানে।আর এই অবস্থায় তরুণদের কাছে জয় গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের আরেক সিনিয়র নেতা দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। বিবার্তাকে তিনি বলেন, ‘জয় ও তারেকের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। তারেক দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকে দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ হুমকি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে, জয় বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র। শিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তার। সাধারণ জনগণ তাকে এমনিতেই গ্রহণ করবে।’জয়ের পদচারণায় আওয়ামী লীগে প্রাণচাঞ্চল্যতা আসবে বলেও মনে করেন দলের সিনিয়র নেতারা। ইতিমধ্যেই তার বক্তব্য নিয়ে দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বেশ উজ্জীবিত।তবে রাজনীতিতে জয়ের আবির্ভাব একেবারেই ভালোভাবে নিচ্ছে না বিরোধী দল বিএনপি। কারণ, তাদের প্রধান কাণ্ডারী তারেক জিয়া রাজনীতিতে ইস্তফা দিয়ে লন্ডন নির্বাসনে। সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে করতে পারেননি এতদিন। তবে মঙ্গলবার জয়ের বক্তব্যের একদিন পর বুধবার সেখানে এক ইফতার পার্টিতে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও আগামী জাতীয় নির্বাচনের এজেন্ডা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তারেক। তবে বিএনপির নেতারা জয়ের বক্তব্যের কড়া সমালোচনায় ব্যস্ত। তাদের বক্তব্য, জয় তার পূর্বসূরিদের মতো হিংসাত্মক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। জয়ের বক্তব্যের মাঝে ষড়যন্ত্রও খুঁজে পাচ্ছেন। রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা অভিযোগ করেছেন, ‘জয় কীভাবে জানে আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে? আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই কারচুপি করে আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে চায় বলেই জয়ের বক্তব্য প্রমাণ করে।’অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতারা জয়ের হয়ে তার প্রতিবাদ করছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জয় যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সমালোচনা বিএনপি করবেই। কারণ, রাজনীতিতে জয়ের আবির্ভাব বিএনপি একেবারেই ভালোভাবে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। আর সেক্ষেত্রে জয়ের বক্তব্যকে ডিফেন্ড করাও আওয়ামী লীগ নেতাদের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। কারণ, জয় এভাবেই রাজনীতিতে তার জায়গা পোক্ত করে নেবেন। আর রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে হলে সমালোচনা সহ্য করতেই হবে তাকে।তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে জয়ের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত জায়গা দখল করা সহজ হয়ে গেছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, সামনে জাতীয় নির্বাচন। আর এ তারেক রহমান নির্বাচনের আগে দেশে ফিরতে পারবেন কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।এছাড়া এখনো অধিকাংশের কাছে তারেকের ভাবমূর্তি সেই আগের মতোই কলুষিত। এ অবস্থায়, জয় তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দিয়ে এবং তার শিক্ষাগত জ্ঞানের আলোয় জনমনে জায়গা করে নিতে পারবেন। তবে বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে হওয়ায় তাকে অনেক হিসেব করেই কথাবার্তা বলতে হবে বলে মনে করেন তারা। শনিবার সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৪২তম জন্মবার্ষিকী গেল। বয়সেও ভারত্ব আসছে তার মধ্যে।এই অবস্থায় সামনে জাতীয় রাজনীতিতে জয় কিভাবে তার জায়গা করে নেয় সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থক, কর্মী ও নেতারা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হয়তো।




