শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়যে কোনো দিন কাদের মোল্লার আপিল মামলার রায়

যে কোনো দিন কাদের মোল্লার আপিল মামলার রায়

আদালত প্রতিনিধিঃ (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর রায় নিয়ে করা আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। যে কোনো দিন এ আপিল মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি শেষ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এর অাগে সোমবার আসামিপক্ষে শুনানি শেষ করেন ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। হাইকোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচজন বিচারপতি মামলার রায় যে কোনো দিন বলে আদেশ দেন।

এর মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় মামলাটির (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনাম আব্দুল কাদের মোল্লা) রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রেখেছেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।

প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হচ্ছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৬টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল তাকে ৫টি অপরাধে দায়ী করে দু’টিতে যাবজ্জীবন ও তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন। একটি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি উল্লেখ করে ওই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দণ্ডাদেশ না দেওয়ায় এবং একটি অপরাধের অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ায় সাজা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ রায়ের বিরুদ্ধে গত ৩ মার্চ আপিল করেন প্রসিকিউশন। আপিলে ওই ৫টি অভিযোগে দেওয়া সাজা অপর্যাপ্ত দাবি করে এবং খালাসের আদেশ বাতিল চেয়ে সর্বোচ্চ দণ্ড ফাঁসির আরজি জানানো হয়। আর ৪ মার্চ প্রমাণিত সকল অভিযোগ থেকে খালাসের আবেদন জানিয়ে আপিল করেন আব্দুল কাদের মোল্লা।

শুনানির কার্যক্রম
আপিল শুনানি ও অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত প্রদানের জন্য ৩৯ কার্যদিবস সময় লেগেছে আপিল বিভাগে। এর মধ্যে ১৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষ ও ১৯ কার্যদিবসে আসামিপক্ষ শুনানি করেছেন। আদালত মনোনীত ৭ জন অ্যামিকাস কিউরি তাদের মতামত দিয়েছেন ৬ কার্যদিবসে।

গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় আপিল শুনানি। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষ ও পরে আসামিপক্ষের করা আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

এর মধ্যে ১ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত, ৬ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত এবং মঙ্গলবার মোট ১৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান। অন্যদিকে ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ জুন পর্যন্ত এবং সোমবার ১৯ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের শুনানিতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়ার বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তার সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় পাঠ, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ সংশোধনী বিষয়ে বক্তব্য এবং আসামিপক্ষের যুক্তির জবাব দেন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষ কাদের মোল্লাকে খালাস দেওয়ার পক্ষে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন এবং রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির জবাব দেন।

এর আগে গত ১০ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৬ সদস্যের বেঞ্চ শুনানির জন্য ৩১ মার্চ রোববার দিন ধার্য করেন। তবে ওই দিন আপিল বিভাগের নতুন বিচারপতিদের শপথ গ্রহণ ও সংবর্ধনার জন্য এ মামলার শুনানি শুরু হয়েছে গত ১ এপ্রিল। একজন বিচারপতি ইতিমধ্যে অবসরে চলে যাওয়ায় শুনানি সম্পন্ন হয় ৫ বিচারপতির বেঞ্চে।

অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত
আপিল শুনানি চলাকালে দু’টি আইনগত প্রশ্ন দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ (প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন) এর আওতায় কাদের মোল্লার মামলার এই মামলা পড়বে কিনা এবং দ্বিতীয়টি হল আপিলের সমান সুযোগ রেখে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এ যে সংশোধনী আনা হয়েছে এবং ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে তার যে ভুতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে- সেটি এ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিনা।

এ দু’টি বিষয়ে আদালতকে সহায়তা করতে গত ২০ জুন সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিযুক্ত করেন আপিল বিভাগ। তাদের কাছে দু’টি বিষয়ের ওপর আইনগত ব্যাখ্যা জানতে চান আপিল বিভাগ।

৭ অ্যামিকাস কিউরি ৬ কার্যদিবসে মতামত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে এ সংশোধনী আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মতামত দিয়েছেন ৫ জন। তারা হচ্ছেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। অন্য দুই অ্যামিকাস কিউরি টিএইচ খান ও এএফ হাসান আরিফ মনে করছেন, এটি প্রযোজ্য হবে না।

অন্যদিকে কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ (প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন) এর আওতায় এ মামলা পড়বে বলে তিনজন, পড়বে না বলে দুইজন এবং অন্য দুই জন ভিন্ন ধরনের মতামত দিয়েছেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের মতে, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও এএফ হাসান আরিফের মতে, প্রযোজ্য হবে। আর ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসির মতে, প্রযোজ্য হবে, যদি তা দেশীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। দেশীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে এটি প্রযোজ্য হবে না। টিএইচ খানের মতেও প্রযোজ্য হবে। তবে তিনি মনে করেন, যে ক্ষেত্রে দেশীয় আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনকে সাংঘর্ষিক বলে মনে হবে, সে ক্ষেত্রে দেশীয় আইন প্রাধাণ্য পাবে।

প্রসঙ্গত, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কাদণ্ডাদেশের রায়ের পর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন করে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে রায়ের বিরুদ্ধে উভয় পক্ষের আপিল করার বিধান রাখা হয়। আগে শুধু আসামিপক্ষ আপিল করতে পারতেন।

কাদের মোল্লার প্রমাণিত অপরাধ
ট্রাইব্যুনালের রায় অনুসারে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ছাত্র ও আইনজীবীসহ আরো অনেককে হত্যার মোট ৬টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এর মধ্যে প্রমাণিত প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, একাত্তরের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন কাদের মোল্লা।

দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় গিয়ে হত্যা করেন।

প্রমাণিত তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৯ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে আরামবাগ থেকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন।

পঞ্চম অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনা ও অবাঙালি রাজাকারদের সঙ্গে কাদের মোল্লা মিরপুরের আলোকদী (আলুব্দী) গ্রামে হামলা চালান। ওই ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি শহীদ হন।

ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৬ মার্চ কাদের মোল্লা, তার সহযোগী এবং পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যান। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত, তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার হন শহীদ হযরত আলী লস্করের এক মেয়ে।

প্রমাণিত হয়নি ঘাটারচর গণহত্যা
তবে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেছেন, ঘটনা ঘটলেও কেরাণীগঞ্জের ঘাটারচর গণহত্যার সঙ্গে কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষ। এটা ছিল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ অভিযোগে।

এ অভিযোগ অনুসারে, ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লা ও ৬০-৭০ জন রাজাকার কেরাণীগঞ্জ থানার ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটারচরে (শহীদনগর) শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর বিধান অনুসারে রায় ঘোষণার এক মাস অর্থাৎ ৩০ দিনের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশনা রয়েছে।

আরও দুই মামলা শুনানির অপেক্ষায়
কাদের মোল্লার মামলাটি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা। এ আপিল মামলাটির শুনানিও শেষ হলো প্রথমেই। আরও দু’টি আপিল মামলা ট্রাইব্যুনাল থেকে এসেছে আপিল বিভাগে। মামলা দু’টিতে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়েছেন  যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল।

সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেছেন রাষ্ট্র ও আসামি উভয়পক্ষই। কামারুজ্জামান তার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেননি।

সাঈদীর মামলায় প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষ আর ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে খালাসের আরজি জানিয়ে আপিল করেছেন আসামিপক্ষ। কামারুজ্জামানও আপিল করেছেন ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে খালাস চেয়ে।

এ দুই আপিল মামলাই শুনানি শুরুর দিন ধার্যের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ