ষ্টাফরিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
আজ জাতির শোকাবহ দিন। বেদনাবিধুর হৃদয়ে বাঙালি আজ স্মরণ করবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আজ জাতীয় শোক দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে দিবসটি। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।
দিবসটিকে ইতোমধ্যেই সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারি কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন। এছাড়া বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
এদিন সকাল সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অফ অনার প্রদান শেষে অনুষ্ঠিত হবে মোনাজাত ও কোরআন তেলাওয়াত।
এছাড়াও ১৫ আগস্টে শাহাদাতবরণকারী জাতির জনকের পরিবারের সদস্য ও অন্যান্য শহীদের কবরে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে ফাতেহা পাঠ করবেন।
এদিন সকাল ১০টায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে ফাতেহা পাঠ, প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণ ও সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অফ অনার প্রদানসহ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সমপ্রচার এবং সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। এছাড়াও জাতীয় জাদুঘর শোক দিবস উপলক্ষে তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ ‘পলাশি থেকে ধানমন্ডি’ শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শন করবে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনের সকল স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন।
সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
একই দিনে টুঙ্গীপাড়ায় সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
এ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত থাকবে। চট্টগ্রামেও আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে। এ উপলক্ষে টুঙ্গীপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ ।
ছাত্রাবস্থা থেকেই প্রতিবাদী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালে তিনি তৎকালীন জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মাওলানা ভাসানীর মতো ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসেন। ’৪০-এর দশকে অবিভক্ত বাংলায় সংঘটিত দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলায় তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। ’৪৭ সালে দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করেন তিনি। ’৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ কার্জন হলে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর এই ঘোষণার পর সারা পূর্ববঙ্গে বিশেষ করে ঢাকায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেই প্রতিবাদ একসময় ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৫২ সালে কারান্তরীণ থেকে তিনি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে তিনি সে-সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। সে-মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ সদস্য।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেশ ক’জন বাঙালি তরুণ। এ ঘটনার পরে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নিতে বাধ্য হয় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। ’৫২-এর সেই আন্দোলন ভাষার জন্য হলেও এ ঘটনা বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিল। বাঙালির এই স্বাধীনতার স্পৃহা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। যে-কারণে তিনি ৬ দফার মতো এক ঐতিহাসিক দাবিনামা পেশ করেন। পরবর্তীতে ৬ দফার পক্ষেই জনগণ ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে ভোট দেয়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গরিমসি করতে থাকে তৎকালীন ইয়াহিয়া সরকার। ২৫ মার্চের মধ্যরাতে পশ্চিমারা ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর আক্রমণ শুরু করলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি প্রথম ও প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে। বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি-সংগ্রামকে একটি যৌক্তিক ও সফল পরিণতিতে এনে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যোগ্যতা, মেধা, পরিশ্রম ও খাঁটি দেশপ্রেমের কারণে টুঙ্গীপাড়ার এক সাধারণ পরিবারের সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির জাতির জনকে পরিণত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তিনি যখন আত্মনিয়োগ করছিলেন ও দেশকে সফলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই তাঁকে হত্যা করা হয় অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল কিছু মদ্যপ সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক। সে-রাতে তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, তাঁদের স্ত্রী এমনকি শিশুপুত্র রাসেলকেও হত্যা করে ঘাতকরা। সেই সাথে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজনকে। এই হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তীতে খোন্দকার মোশতাক ও জিয়া সরকার ইনডেমনিটি আইনের দ্বারা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার রুদ্ধ করে রেখেছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার জন্য হত্যা করা হয়েছে অনেক নেতাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডটি শুধু ক্ষমতা বদলের ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়েছে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে। সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে। ফলে দেশে নতুন করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান হয়েছে। প্রগতির চাকাকে পেছনে ঘুরিয়ে রাষ্ট্রকে চরম সাম্প্রদায়িক করে তোলার চেষ্টা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দু মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছে। কারও কারও রায় কার্যকরও হয়েছে। অনেকে পলাতক। হয়তো একদিন তাদের রায়ও কার্যকর হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের জনগণের কপালে যে-কলঙ্কতিলক এঁকে দেওয়া হয়েছিল তা থেকে জাতি কিছুটা হয়তো রক্ষা পেয়েছে। তবে জাতির জনকের স্বপ্নের ক্ষুধাহীন-শোষণহীন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। সেই অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হবে দেশকে।
তাতেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল হতে পারে।




