সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ জিরো টলারেন্সে বিশ্বাসী বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় ভোর পৌনে ৫টার দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে বাংলায় দেয়া ভাষণে তিনি একথা জানান। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের নেয়া চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং নানা সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। নিজে সন্ত্রাসী হামলার শিকার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসীদের উদ্ভব হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করা, তাদের নিয়মিত অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সফল হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। তবে গত ১ জুলাই আমরা এক ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার শিকার হই। ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় দেশীয় কিছু উগ্রপন্থী-সন্ত্রাসী ২০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এ সময় ১৩ জন জিম্মিকে উদ্ধারে সক্ষম হই। এই ভয়ংকর ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আমরা এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করতে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এতে সাড়া দেয়ার জন্য সমগ্র জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। সমাজের প্রতি স্তর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, জনগণের দৃঢ়তা ও সহযোগিতায় আমরা বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হব। একই সঙ্গে আমি সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অর্থ এবং অস্ত্রশস্ত্র যোগান বন্ধ; তাদের প্রতি নৈতিক ও বৈশ্বিক সমর্থন না দেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। এদের সর্বত্রভাবে সমূলে উৎপাটন করার সংকল্পে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এবারের ভাষণে তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো এখন কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সব স্থানেই ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো দেশই আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়, কোনো ব্যক্তিই সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নয়। তিনি বলেন, আমেরিকা থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে এশিয়ায় অগুনতি নিরীহ মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে। সংঘাত বন্ধ করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সব দেশকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, এখনও আমাদের এই বিশ্ব উত্তেজনা এবং ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। বেশ কিছু স্থানে সহিংস-সংঘাতের উন্মত্ততা অব্যাহত রয়েছে। অকারণে অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কী দোষ করেছিল আইলান কুর্দির? কি দোষ করেছিল ওমরান-যে আলেপ্পোতে নিজ বাড়িতে মারাত্মক আহত হয়েছে। একজন মা হিসেবে আমার পক্ষে এসব ঘটনা সহ্য করা কঠিন। বিশ্ব বিবেককে কি এসব ঘটনা নাড়া দেবে না?’
জাতিসংঘের অভিবাসী ও শরণার্থীবিষয়ক সম্মেলনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি- এই সম্মেলনের মাধ্যমে বর্তমান সময়ে অভিবাসনের ধারণা ও বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করবে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বদেশ ও গন্তব্য উভয় স্থানের জন্যই সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃংখল এবং নিয়মিত অভিবাসন সংক্রান্ত গ্লোবাল কমপ্যাক্ট রূপরেখা প্রণয়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসে গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (জিএফএমডি) আয়োজন করতে যাচ্ছি। এখানে আমরা অভিবাসনবিষয়ক গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশা করছি।




