রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের জন্য যে স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের জন্যও সে স্বপ্ন দেখি...

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের জন্য যে স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের জন্যও সে স্বপ্ন দেখি : মোদি

‘জয় বাংলা- জয় হিন্দ’ এই বলেই বক্তৃতা শেষ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর ঠিক এর আগেই তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের জন্য যে স্বপ্ন দেখি, প্রতিবেশি দেশ হিসেবে সে স্বপ্ন বাংলাদেশের জন্যও দেখি।  আর এও বললেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে নিয়ে যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেন তারও সেই একই স্বপ্ন। এভাবেই দুই দেশের মধ্যে মিল, সাযুজ্য টেনে দির্ঘ বক্তৃতায় আঁকলেন এক সুসম্পর্কের ছবি। যা অতীতেও ছিলো, এখনও আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। মোদির এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভারত দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা পেলো। বাংলাদেশকে পাশে রেখে নয়, বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলার স্বপ্নের কথা বললেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বললেন বাংলাদেশকে নিয়ে এ স্বপ্ন আজকের নয়, এ স্বপ্ন ‍বাংলাদেশ যখন একটি দেশ হিসেবে জন্ম নেয় তখনও ভারতের স্বপ্ন ছিলো একটি স্বাধীন বাংলাদেশ, বলেন মোদি। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলো ভারত। আর সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধে সেনা পাঠিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল হয় তার দেশ।

মোদি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশের বিকাশ। আমাদের চিন্তায় ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। যার কারনেই আমরা সেদিন নিজেদের সমস্যার দিকে তাকাইনি। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছি।  রোববার ঢাকা সফরের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এই ভাষণের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্তের স্বপ্ন ছড়িয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে যান নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের সন্ত্রাস বিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে আজ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এ অবস্থায় বাংলাদেশ যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে তাতে আমি স্যালুট করি। শেখ হাসিনাই এটা করতে পেরেছেন। শেখ হাসিনার একটাই লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন, আর সে কারণেই বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে, বললেন মোদি।

এর আগে বক্তব্যের শুরুতেই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িকে সম্মাননা দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, আমি আরও সম্মানিত বোধ করছি এই সম্মাননা আমি গ্রহণ করতে পেরেছি এক মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে। আরও সম্মানিত বোধ করছি সেসময় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মোদি স্মরণ করেন বাংলাদেশের সঙ্গে তার এক আবেগঘণ সম্পর্কের কথা। তিনি বলেন, যখন তিনি রাজনীতি থেকে মুক্ত তখনই তার জীবনের প্রথম যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ তা ছিলো বাংলাদেশ সম্পর্কিত। বাংলাদেশের জন্য সত্যাগ্রহে অংশ নিতে তিনি সেই ছোটবেলা প্রথমবার গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন। সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্ত চুক্তি নিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের খবরের কাগজেও এসেছে আমি বলেছি এটা বার্লিনের দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। আমি সত্যিই মনে করি এ এমনই এক ঘটনা।  তিনি বলেন, এই সমঝোতা স্রেফ কয়েক কিলোমিটার জমির ভাগবাটোয়ার‍ার নয়, এই সমঝোতা একটি দুই দেশের অন্তরকে জোড়া লাগানোর সমঝোতা।

ভূমি নিয়েই যুদ্ধ হয়। কিন্তু দুই দেশ শান্তিপূর্ণভাবে এই সমস্যার সমাধান করলো। তিনি বলেন, অন্য দেশের হলে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতো। কিন্তু আমরা গরীব দেশ। আমাদের দিকে কেই খেয়াল রাখে। কেউ খেয়াল রাখে কি না তা আর পরোয়া করি না, একসঙ্গে চললে সবাই দেখবে এরা এক সঙ্গে এগিয়ে চলছে, সেটাই হবে আমাদের বড় শক্তি বলেন মোদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বক্তৃতা অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্থল সীমান্ত চুক্তি শুধু জমির সমাধান নয়। এ চুক্তি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সেতু তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আরেকটি বড় মিল দেখাতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন দুই দেশের জনসংখ্যারই ৬৫ ভাগ যুব বয়সী। এটি যুবশক্তিই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।  বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এগিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অর্জনে ভারতও গর্বিত। বাংলাদেশ পূবের আর ভারত পশ্চিমের দেশ। পূর্বে সূর্য উঠলে পশ্চিমে তো তার আলোর ছটা পৌঁছাবেই।  সার্ক দেশগুলোর প্রত্যেক মানুষের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, এ জ্ঞানই আগামী দিনেও একজোট হয়ে সার্ক দেশগুলোর এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেবে। সার্কের পাঁচটি দেশ রয়েছে যাদের সমুদ্রবন্দর রয়েছে। এটা ব্যবহার করলে এগিয়ে যেতে পারি। এমন ব্যবস্থা থাকবে যেন আসা-যাওয়া সহজ হয়।

শনিবার বিকেলে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে যে ২২টি বিষয়ে সমঝোতা ও চুক্তি হয় সেগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কেবল ২২টি বিষয় নয় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সহযোগিতা আর এক সাথে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা। তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশ থেকে কিছু ভারতে পাঠাতে হলে সিঙ্গাপুর হয়ে আসতে হতো। এখন আর তা করতে হবে না। বিশাল সমুদ্রে যে ব্লু ইকোনমি তা একজোট হয়ে আবিষ্কারের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। বাংলাদেশ নেপাল ভুটান ভারত যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখ করে মোদি বলেন, বাংলাদেশ-ভারতে আমরা রেল-সড়ক, উড়োজাহাজ এমনকি সমুদ্রপথেও যোগাযোগ গড়ে তুলবো। মোদি বলেন, কতো বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে, তা আমরা দেখতে পাই। অস্ত্রশক্তি, জনশক্তি যাই থাক একা কিছু করা যায় না। অন্যের সহযোগিতা ছাড়া বিশ্ব চলতে পারে না। ভারত এবং বাংলাদেশের লক্ষ্য এক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে সে স্বপ্ন নিশ্চয়ই পূরণ হবে। তবে মহাকাশে সকলে মিলে একযোগে সার্ক স্যাটেলাইট স্থাপন করতে হবে। একজোট হয়ে কাজ করলে কখনও মনে করি না এ অঞ্চলে অন্ধকার থাকবে। একজোট হওয়ার কথা বলি, কেননা, ত্রিপুরায় বিদ্যু‍ৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় আমরা বাংলাদেশের সহায়তা না পেলে সম্ভব হতো না। বাংলাদেশকে এরই মধ্যে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সহায়তা না পেলে ত্রিপুরায় বিদ্যু‍ৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব হতো না। তাই গতকাল শনিবারই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলাদেশকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যু‍ৎ দেব।  সৌর বিদ্যুত উৎপাদনে যৌথভাবে কাজ করার আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এক সময় সূর্য সমস্যার কারণ ছিল। কিন্তু এখন সূর্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য নরেন্দ্র মোদিকে মঞ্চে নিয়ে যান। তার হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন ঢাবি উপাচার্য।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রশংসা করতেও ভোলেন নি মোদি। তিনি বক্তৃতায় বলেন, দেরিতে খেলা শুরু করলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এখন আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ভারতীয় ক্রিকেট দল বাংলাদেশে আসার ঠিক আগের দিন নরেন্দ্র মোদি এ মন্তব্য করেন। এ সময় ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সের ভূয়সী প্রশংসা করে আগামীতে আরো ভালো খেলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বার বার রাজনৈতিক সঙ্কট এলেও বাংলাদেশ সবসময়ই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করে মোদি বলেন, বিশ্বে সমৃদ্ধ দেশ নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু গরীব দেশ নিয়ে আলোচনা হয় না। বাংলাদেশে বার বার রাজনৈতিক সংকট এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও সংকট এসেছে, আর বাংলাদেশ মোকাবেলা করে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকে স্রেফ প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে নয়, বাংলাদেশকে সাথে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন যে স্বপ্ন আমি ভারতকে নিয়ে দেখি একই স্বপ্ন বাংলাদেশকে নিয়েও দেখি।

  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ