রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদআরো খবর......খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন

খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন

সব জল্পনা-কল্পনা আর দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া ফেসবুকে দলটির সবগুলো পেজ থেকে বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তার এই প্রস্থানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার, মা তৈয়বা মজুমদার। খালেদা জিয়ার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশ ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তার আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা (প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা) জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

স্বামী জিয়াউর রহমান যখন ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে রণাঙ্গনে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন দুই শিশু সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ বেগম জিয়া ছিলেন ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি। মুক্তিযুদ্ধের সেই ৯ মাস তিনি চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন।

প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে মৃত্যুর শঙ্কায়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্ত হন। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান যখন সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখনও বেগম জিয়া নিজেকে রাজনীতির চাকচিক্য থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মা ও স্ত্রী। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন, যা তাকে পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যু বেগম জিয়ার জীবনের সব আলো নিভিয়ে দেয়। জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি যখন অস্তিত্ব সংকটে, দলে ভাঙন, ষড়যন্ত্র এবং নেতৃত্বের কোন্দল চরমে, ঠিক তখনই দলের প্রবীণ নেতা ও কর্মীদের অনুরোধে তিনি ঘর ছেড়ে রাজপথে নামেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন এবং ১৯৮৩ সালে দলের হাল ধরেন। রাজনীতিতে তার এই আগমন ছিল অনেকটা ধুমকেতুর মতো। স্বামী হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ান। যে নারী একসময় জনসমক্ষে কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন, তিনিই হয়ে ওঠেন কোটি জনতার কণ্ঠস্বর।

জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন।

এ ছাত্ররা এরশাদের শাসনের পতনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৮০ দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ খ্যাতি পান। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম নেত্রী।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।

তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করে।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনে নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

১৯৯৯ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়। ২০০৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন সেনা শাসিত সরকার গ্রেপ্তার করে। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। নেতৃত্ব দেন বিরোধীদের আন্দোলনে।

২০১৮ সালে কথিত দুর্নীতির মামলায় তাকে কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় তাকে শর্ত সাপেক্ষে বাসায় থাকার অনুমতি দেয় সরকার। কারাগারে থাকার সময়ে তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়। বাসায় ফিরলেও তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও সরকার সে অনুমতি দেয়নি। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসলেও সময়ে সময়ে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা ‘উপবৃত্তি’ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিলেন। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে। রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া যতো আসনে নির্বাচন করেছেন তার কোনোটিতেই পরাজিত হননি। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ