বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদফিচারব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর শহীদ জীবন ঘোষাল : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর শহীদ জীবন ঘোষাল : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি বিশেষ দিন। চট্টগ্রামের জন্যও দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর ফরাসী অধ্যুাষিত চন্দনগরে সুহাসিনী গাঙ্গুলী ওরফে পুটুদি’র বাড়িতে অনন্ত সিং ও গণেশ ঘোষের সঙ্গে আত্মগোপনে অবস্থানকালে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে জীবন ঘোষাল গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করেন।

জীবন ঘোষালরা আমাদের ঐতিহ্য, এটা এখন বেশি করে বলা সময় এসেছে। কারণ অর্বাচীন ছেলেরা সেসব কথা বলাবলি করছে, তাতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী অধ্যায়ের বীর সৈনিকরা নাকচ হয়ে যান। কিন্তু এটা তো মানতেই হবে যে, মাস্টারদা সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, প্রমোদ চৌধুরী, হরি গোপাল বল টেগরা, অর্ধেন্দু দস্তিদার এবং ক্ষুদিরাম ও বিনয়-বাদল-দীনেশরা মুক্তির মন্দির সোপানতলে নিঃশেষে জীবন দান করেছিলেন বলে ১৫/১৬ বছরের ব্যবধানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা লেজ গুটিয়ে ভারত থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমস্ত সংগ্রামের ঐতিহ্য আমাদের ঐতিহ্য। পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের লাহোরে শের-ই-বাংলা-এ কে ফজলুল হক পাকিস্তান উত্থাপনের পরই পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়। তারপর ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সাম্প্রদায়িকতা ও পাকিস্তান আন্দোলন ঢুকে যায়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও প্রথমে কংগ্রস নেতাই ছিলেন। সেজন্য সরোজিনী নাইডু তাঁকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূত বা Ambassador of Hindu-Muslim unity. সুতরাং দেশবন্ধু সি আর দাশ, দেশপ্রিয় জেএম সেনগুপ্ত, চট্টল গৌরব মহিম চন্দ্র দাশ, যাত্রামোহন সেন, কুমিল্লার কামিনী কুমার দত্ত, বর্ধমানের ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, রবিশালের মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত এবং ঢাকার আনন্দ কুমার গুপ্ত প্রভৃতি জননায়করা যে সংগ্রাম করেছেন, সেগুলি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা জন্যই করেছেন। ভারতবর্ষ তখনও হিন্দু-মুসলিমানের অভিন্ন দেশই ছিলো।
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাটে জীবন ঘোষাল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা যশোদা ঘোষাল ছিলেন যশোরের বিশিষ্ট ধনী ভদ্রলোক।

জীবন ঘোষাল একজন প্রথম সারির বিপ্লবী। ব্যাঙ্কের চেকে বাবার সই জাল করে মাস্টারদার বিপ্লবী অর্থভাণ্ডারে ষোলশো টাকা দান করেন তিনি।

চট্টগ্রাম যুব-বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন জীবন ঘোষাল। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল, ফেনী রেল স্টেশন সংষর্ঘের বীর সৈনিক।”
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির (ভারতীয় গণতন্ত্রী বাহিনী) চট্টগ্রাম শাখার অন্যতম বিপ্লবী কর্মী দীর্ঘকায় সুগঠিত জীবন ঘোষাল মাখন সামরিক পোশাকে সজ্জিত হয়ে ডজ গাড়ি নিয়ে চলেছেন চট্টগ্রাম শহরের টাইগার পাসে অবস্থিত ব্রিটিশ পুলিশের অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগারের দিকে। গাড়িতে সঙ্গী জেনারেল লোকনাথ বল ও বিপ্লবী নেতা নির্মল সেন। গাড়ি গিয়ে থামল একেবারে অস্ত্রাগারের সিঁড়ির সামনে। লোকনাথ বলের গুলিতে প্রাণ হারাল প্রহরী। আরো কয়েকজন প্রহরারত সৈনিক আহত হল। পালিয়ে গেল অন্যরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার দখল হয়ে যায়। তারপর জীবন ঘোষালের আর এক কাজ। গাড়ির পেছনে দড়ি দিয়ে আর্মারির দরজার আংটার সঙ্গে বেঁধে জীবন আবার চালালেন গাড়ি। আংটাটাই ভেঙ্গে পড়ল। তারপর শরীরের ধাক্কায় অস্ত্রাগারের লৌহকপাট খুলে পড়ল। প্রয়োজনীয় অস্ত্রাদি গাড়িতে তুলে নিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল অস্ত্রাগারে। এরপর তারা ছুটে চললেন দামপাড়ায় পুলিশের প্রধান অস্ত্রাগারের দিকে (বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর)। পুলিশলাইন ভারতীয় গণতন্ত্রী বাহিনীর দখলে আগেই এসে গেছে। পুলিশলাইনের অস্ত্রাগার থেকেও প্রয়োজনীয় অস্ত্রাদি হস্তগত করার পর সেখানেও আগুন দেওয়া হয়। আগুন লাগাতে গিয়ে জ্বলে উঠল হিমাংশুর পোশাক। আহত হলেন ভীষণভাবে হিমাংশু। অগ্নিদগ্ধ হিমাংশুকে নিয়ে যে গাড়ি আনন্দের বাড়ির দিকে ছুটল সে গাড়িতে জীবন ঘোষালও ছিলেন।

এরপরে মূলবাহিনীর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা আর সম্ভব হয়নি। ছদ্মবেশে কলকাতা যাবার পথে ফেনী স্টেশনে ধরা পড়লে পুলিশ প্রথমেই মাখনের দেহ তল্লাশ করতে গেলে অনন্ত সিং গুলি ছোঁড়েন, পালাতে গিয়ে মাথায় আঘাত পান জীবন। অবিশ্রান্ত রক্ত ঝরতে থাকে। গোলমালে চারজনই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরে তিনজন আবার একত্রিত হন। অবশেষে ছদ্মবেশে লুকিয়ে কলকাতা হয়ে তাঁরা চন্দননগরে পুটুদির বাড়িতে আশ্রয় নেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের বড় কর্তা কুখ্যাত টেগার্টের নেতৃত্বে দু’ট্রাক ব্রিটিশ সার্জেন্ট ঘিরে ফেলে চন্দননগরের বাড়ি।
সেদিন রাতে প্রহরী ছিলেন জীবন। বিপ্লবীরা কলাবাগানের ভিতর দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সার্জেন্টদের জোরালো টর্চের আলোয় তা সম্ভব হয়নি। শুরু হয় গুলি বিনিময়। জীবন ছিলেন পুকুরের পাড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে জলের মধ্যে পড়ে যান তিনি। একজন বিপ্লবীর জীবনদীপ এভাবেই নিভে গেল অসময়ে।
পুটুদি জেলাখানায় কল্পনার দত্তের কাছে চন্দনপুরে তাঁদের ধরা পড়ার ঘটনা বলতে গিয়ে জীবন ঘোষাল প্রসঙ্গে বলেন, “জানিস, আমাদের এখানে যেদিন মাংস রান্না হয়, আমার মুখে দিতে ইচ্ছে করে না, খেলে মনে হয় মাখনের কথা, ও আমার কাছে মাংস খেতে চেয়েছিল, মাসের শেষে টাকা হাতে না ছিল না বলে ওকে বলেছিলাম আগামী মাসের ১ তারিখ বেতন পেলে মাংস কিনে নিয়ে আসব; কিন্তু ওকে আর খাওয়াতে পারিনি।”

লেখক: নাসিরুদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ