বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদফিচারশওকত হাফিজ খান রুশ্নি : কবি ও বিপ্লবী : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

শওকত হাফিজ খান রুশ্নি : কবি ও বিপ্লবী : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

শওকত হাফিজ খান রুশ্নির স্বল্পকাল স্থায়ী জীবন বিদ্রোহ-বিপ্লবে তুমুল আলোড়ন তুলে হঠাৎ ফুরিয়ে গিয়েছিলো। শওকত হাফিজ খান রুশ্নিকে ভোলা যায় না। ঈশ্বরের কাছ থেকে পৃথিবীতে বেশিদিন বসবাসের অনুমতি নিয়ে তিনি আসেননি। সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে দমকা হওয়ার মত এসেছিলেন তিনি এবং তাঁর স্থান ও সময়কে তুমুল দ্রোহে মাতিয়ে চলেও গেলেন একদিন। তখন তিনি হয়তো হাসছিলেন কিন্তু তাঁর সংসর্গ, সম্পর্কে যাঁরা আবদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁদের তখন কেঁদে বুক ভাসানোর সময়; রুশ্নির কথা মনে হলে এখনো আমাদের চোখ অশ্রæসজল হয়ে ওঠে। কেননা, রুশ্নি একজন বিরল প্রজাতির মানুষ। তাঁরা গÐায় গÐায় জন্মান না, কোনো এক দশক বা যুগে একজন বা দু’জন রুশ্নি তাঁদের গর্ভধারিনীর কোল আলো করে পৃথিবীতে আবিভর্‚ত হন। তিনি বেঁচেছিলেন দুই কুড়ি সাত বছর, কিন্তু এই স্বল্পকালীন ক্ষণস্থায়ী আবাসে কী বিপুল বিস্ময় জাগিয়েছিলেন তিনি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। অসীম সৃজনপসূ এক জীবন তাঁর মাতৃভ‚মির বিপ্লবে, বিদ্রোহে, সর্বহারার শৃঙ্খল-মোচনে ও শোষণ মুক্তির সংগ্রামে-সংকল্পের দুন্দুভি আর নাকারা বাজিয়ে সামাজিক মুক্তির প্রবল কম্পন উপস্থিত করে নীরব হয়ে গেলেন আমাদের রুশ্নি ভাই। প্রথম তিনি একজন কবিই ছিলেন। ষাটের দশকে যখন তিনি কাব্যভুবনে ভীরু পায়ে পদার্পণ করেছিলেন, তখন প্রেমের স্থলে কাব্যল²ীর অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছেন দেশমাতা। ব্রিটিশের সময়ে একবার পরাধীনতার নাগপাশে বাঁধা পড়েছিলো তাঁর মাতৃভ‚মি; তখন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, তারকেশ্বর, রামকৃষ্ণ, প্রীতিলতা জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে গুলি, বোমা নিয়ে ব্রিটিশ শোষকদের হত্যা করে স্বদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলা মুক্ত করার মরণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, পাকিস্তানের সময়ে আরেকবার যখন বাংলা মায়ের হাতে পায়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল পড়লো, সিরাজুল আলম খান ও চট্টল শার্দুল এমএ আজিজের কাছ থেকে তখন সেই শৃঙ্খল মোচনের মন্ত্রগুপ্তি নিয়ে ৬ দফা, ২১ দফার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আবু ছালেহ, শহীদ মুরিদুল আলম, আবুল কালাম আজাদ (পরবর্তীকালে এডভোকেট), মোখতার আহমদ, আবু মোহাম্মদ হাশেম, ছাবের আহমদ আসগরী, শওকত হাফিজ খান রুশ্নি, এবিএম নিজামুল হক, ডা. মাহফুজুর রহমান, তোহা গাজী, ডা. গোফরানুল হক, জাকারিয়া চৌধুরী প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। রুশ্নি প্রথমত সাহিত্যের প্রেমে পড়েছিলেন, তারপর মাতৃভ‚মির প্রেম, ব্যক্তিক প্রেম থেকে নৈর্ব্যক্তিক প্রেম। স্বাধীনতা তখন আজকে যেখানে আমাদের ছেলেরা দল বেঁধে খেয়ালখুশিমত দেয়ালে দেয়ালে স্বাধীনতা, ফ্রিডম, দ্বিতীয় স্বাধীনতা লিখছে, তখন স্বাধীনতা লেখার কথা দূরে থাক, উচ্চারণ করাও ছিলো অপরাধ। যে অপরাধের দায়ে শাস্তি হতে পারতো ফাঁসি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য গোপনে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র আগরতলা মামলা দায়ের করে আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চেয়েছিলো। সেই বৈরি সময়ে নিষিদ্ধ শব্দ ‘স্বাধীনতা’ নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন রুশ্নি ভাই। অন্যদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে দেয়ার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৬২ সালে স্বাধীনতার জন্য একটি অগ্রবর্তী রেজিমেন্টেড বাহিনী গড়ে তোলার জন্য ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমদ ও আবদুর রাজ্জাক নিউক্লিয়াস নামে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, রুশ্নি ভাই চট্টগ্রামে তার সদস্য হয়েছিলেন এবং তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, সাহস ও গুপ্ত কার্যক্রম চালানোর দক্ষতা দিয়ে নিউক্লিয়াসের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও দায়িত্বে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ঘাটফরহাদবেগ কুয়ার পাড়ে তাঁর পিতা প্রথিতযশা ফুটবলার ও ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার হাফেজ মিয়ার বাসভবনে নিউক্লিয়াসের গোপন বৈঠক হতো এবং তখন থেকেই তিনি এই গোপন সংঠনের অন্যতম সংগঠক ও সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। এ ধরনের বৈঠক আরো হতো আছদগঞ্জে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদের বাসভবন ও মোমিন রোডে ছালেহ ভাইয়ের বাসায়। রুশ্নি ভাইয়ের রাজনীতি চর্চা ও সাংগঠনিক কর্মকাÐের মূল ক্ষেত্র ছিলো চট্টগ্রাম কলেজ। এই কলেজে ছাত্রলীগের অঘোষিত প্রধান নেতা ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে তিনি যে ধারার রাজনীতি করতেন, চট্টগ্রাম কলেজে সেই ধারার রাজনীতির প্রাধান্য বিস্তারের জন্য আরো একজন বিশিষ্ট নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতেন, তিনি হলেন এবিএম সিরাজুল হক। তাঁদের সঙ্গে কাজ করতেন ইমামুল ইসলাম লতিফি, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, পরবর্তীকালে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস কাজী মনিরুজ্জামান মন্টু। শওকত হাফিজ খান রুশ্নিকে বলা যায় অগ্নিঋষি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালি-অবাঙালি দ্ব›দ্ব দৃশ্যমান বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করে আত্মপ্রকাশ করে। ৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা স্বায়ত্তশাসনের আকাক্সক্ষাকে জাগ্রত করে প্রবল ঝাঁকুলি দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত¡াকে জাগিয়ে তোলে। সে সময়ে রুশ্নি ভাই এক ঝড়ের পাখি। তাঁর কলম থেকে উৎসারিত কবিতার পংক্তি যেন অগ্নিস্ফ‚লিঙ্গ হয়ে ঝরে পড়তে থাকে। তারপর ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাঙালির নিরংকুশ রায়ের পর স্বাধীনতা বাঙালির দৃষ্টিসীমার মধ্যে প্রতিভাত হতে থাকে। ততদিনে গোপন কথাটি আর গোপন রইল না। স্বাধীনতার প্রশ্নে ছাত্রলীগের সমস্ত দল-উপদল, সকল নেতা-কর্মী একমত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। নিউক্লিয়াস স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে রূপান্তরিত হয়। প্রকৃতপক্ষে রুশ্নি ভাই যে রাজনীতির চর্চা করতেন তারই জয় হলো। ২ মার্চ ৭১ ডাকসুর ভিপি আ.স.ম. আবদুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। রুশ্নি ভাই’র সাহিত্য চর্চার কথা খুব একটা বলা হয়নি। রুশ্নি ভাই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, প্লেখানভ, লিও শাওচি, মাও সেতু, চেগুয়েভারা, সামির আমিন, রোজা লুক্সেমবার্গ, হোচিমিন, রেজিস দেব্রে ইত্যাদি সারা পৃথিবীর সমস্ত মার্কসবাদী লিটারেচার অধ্যয়ন এবং অনুশীলন করতেন তিনি। মধ্যবর্তী ঘরের সন্তান তিনি, স্বপ্ন দেখতেন শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষ তথা সর্বহারার মুক্তির; সেজন্য পেটিবুর্জোয়া দোদুল্যমান মানসিকতার কবর দিয়ে শ্রেণিচ্যুত হওয়ার সাধনায় লিপ্ত হয়েছিলেন। মার্কসবাদী রাজনীতির প্রভাবে তাঁর সাহিত্যেও বাম চিন্তা ও বাম পন্থার তীব্র প্রভাব পড়েছিলো। সাহিত্য চর্চার উষাকালে তাঁর কবিতার উপজীব্য ছিলো প্রেম, মানুষী প্রেম। কবিতাকে প্রণয়িনী করে কবিতার সঙ্গে ঘর-গেরস্থালি করেছিলেন। পরবর্তীকালে ব্যক্তি প্রেম হয়ে যায় প্রথমে দেশপ্রেম, পরে শ্রেণী সংগ্রাম। তিনি যখন সাহিত্য চর্চা আরম্ভ করেন, তখন চট্টগ্রামে যাঁরা কাব্যচর্চা করতেন, তাঁরা প্রায় সবাই বিশুদ্ধ কবি, কলাকৈবল্যবাদী। রাজনীতিকে সুয়োরাণী করে যাঁরা কাব্যল²ীর আরাধন্য করতেন, তাঁদের মধ্যে তিনি ছাড়া দুরবীন দিয়ে খুঁজে তিনজকে পাওয়া গেলÑ ড. মাহবুবুল হক, হেনা ইসলাম, নুর মোহাম্মদ রফিক, আবুল কাশেম স›দ্বীপ; মৃদুল গুহও দ্রোহকালের কবি কিন্তু বয়সে ন্যুন। আবুল মোমেন, ময়ুখ চৌধুরী, কঙ্কন নন্দী, দিলীপ মালাকার, স্বপন দত্ত, আলতাফ হোসেন-রা পাশের ঘরে উঁকি দেয়ার মতো কখনো রাজনীতির প্রতি অপাঙ্গে দৃষ্টিপাত করতেন। কিন্তু রাজনীতি কখনো তাঁদের প্রেমিকা হয়ে উঠেনি। এর মধ্যে ময়ুখ চৌধুরীর মধ্যে একটা ভিন্নধর্মিতা, স্বাতন্ত্র্য ছিলো। তাঁর নাম তো আনোয়ারুল আজিম, বিখ্যাত শিক্ষকের পুত্র, কিন্তু তাঁর অগ্রজ জসিম ভাই এর সঙ্গে আবার সম্পর্ক ছিলো ছাত্রলীগের আহমদ শরীফ মনীর ভাই, মাহবুব ভাইয়ের (আ. ফ. ম মাহবুবুল হক) সঙ্গে। রুশ্নি ভাইয়ের সমসাময়িক এবং অন্তর্বর্তীকালে আরো যাঁরা কাব্যচর্চা করতেন, রাজনীতিক না হলেও কবিতার অন্দরমহলে থেকে তাঁদেরকে ছাঁটাই করে দেয়া যায় না। অভীক ওসমান, যিনি সেই সময় শক্তিশালী কাব্যপ্রকরণ নিয়ে ভবিষ্যতের একজন বিশিষ্ট লেখকের আবির্ভাব আসন্ন করে তুলেছিলেন, তাঁর স্মৃতি হাতড়ে এই নামগুলো উদ্ধার করা গেলÑজামালউদ্দিন বাবুল, খন্দকার আখতার আহমদ, কাসাকো সাহো, মোস্তফা ইকবাল, শুক্লা ইফতেখার, আহমেদ খালেদ কায়সার, ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, সাথী দাশ, মৃদুল গুহ, মৃদুল চক্রবর্তী, কমল সেনগুপ্ত, শ্যামলী মজুমদার, অধ্যাপক ফাউজুল কবির, অধ্যাপক আনন্দ মোহন রক্ষিত, শ্যামল ওদুদ, শিশির দত্ত, আবসার হাবীব, অভীক ওসমান, মাহবুবুর রহমান, শামসুল হক হায়দরী, খালিদ আহসান, নাজমুন নাহার মন্ডা। রুশ্নি ভাইয়ের প্রতিভা ছিলো। একাডেমিক রেজাল্টে যেমন তাঁর স্ফূরণ ঘটেছে, তেমনি, রাজনৈতিক জীবনেও তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মার্কসবাদ আয়ত্ত করার জন্য প্রচুর পড়াশোনা করতে হতো। অনেক বই, যেমন কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, মার্কসের ক্যাপিটাল, এঙ্গেলসের এন্টি ডুরিং, লিও শাও চির হাউ টু বি এ গুড কমিউনিস্ট, লেনিনের স্টেট এন্ড রেভ্যলুশন ইত্যাদি কত বই যে গড়তে হতো তার ইয়ত্তা নেই। যাঁরা মার্কসবাদী লিটারেচার পড়ে মার্কসবাদে দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে রুশ্নি ভাই’র নাম বেশ আগেই থাকবে। তখনকার রাজনীতিতে মার্কসবাদী তত্ত¡ালোচনা নিয়ে একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা যেন হতো নেতৃবৃন্দের মধ্যে। রুশ্নি ভাই যেমন তত্ত¡জ্ঞ ছিলেন, তেমনি তত্তে¡র ব্যাখ্যাতাও ছিলেন। তিনি জনসভার বক্তা নন, চার দেয়ালে মধ্যে যেসব আলোচনা, আড্ডা, ঘরোয়া সভা হতো, সেখানে ফৈজ আহদ ফৈজ, সাদী, গালিব, ইকবালের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি যখন তাঁর বক্তব্য পেশা করতেন, তখন তাঁর কণ্ঠ হয়ে যেত গদ্য কবিতার চমৎকার নির্ঝর। তিনি জানতেন অনেক, সেজন্য তাঁর বক্তৃতা হতো জ্ঞানগর্ভ। তাঁর কণ্ঠস্বরের একটি সম্মোহন ছিলো, সেই মাদকতাময় কাব্যিক কণ্ঠে যখন সাদু গদ্যে তাঁর তত্ত¡-তথ্য সমৃদ্ধ যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতা উপস্থাপন করতেন, বাচিক শিল্পের সেই অনুপম প্রদর্শনী তখন শ্রোতাদের বর্ণে যে মধু বর্ষণ করতো, তা’ যেন এক অনির্বচনীয় লোকে নিয়ে যেত তাঁদের। তাঁর কাব্যিক বচন, ভাষণ, মার্কসীয় তত্ত¡ালোচনা শুনে মোহাবিষ্ট হয়ে সে সময়ের অনেক তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, যাঁরা স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগুনে পতঙ্গের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো, তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট ক’টি নাম নিতে হচ্ছে, আমার বন্ধু মোজাম্মেল হোসেন শামীম, সুশীল বড়–য়া, সৈয়দ আবদুল মাবুদ, আবু জাফর মাহমুদ, সাথী দাশ, কামরুল, মনি, বশর, খোকন, খালেদ নোমান নমি, নুর মোহাম্মদ। শওকত হাফিজ খান রুশ্নি জন্মেছিলেন মহাকবি নবীন সেন ও চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টাদা সূর্য সেনের জন্মধন্য পূণ্যভ‚মি রাউজানে। তাঁর জন্মসন ১৮ আগস্ট, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ, থানা রাউজান কাগতিয়া খালের কুল। তাঁর জন্মের সঙ্গে তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা কোইনসাইড করে। এক, সে বছর ৪ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আত্মপ্রকাশ; দুই, একই বর্ষের ২৯ সেপ্টেম্বর হাটহাজারীতে পাকিস্তানের প্রথম গণহত্যা; হালদা খালের টেক কাটতে গিযে পুলিশের গুলিতে ১১ জন গ্রাসবাসীর প্রাণহানি; সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ২১ মার্চ ও ২৫ মার্চ; ওই দু’দিন পাকিস্তানের বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যথাক্রমে রেসকোর্স ময়দান ও কার্জন হলে তাঁর ভাষণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে ছাত্ররা এর প্রতিবাদ জানালে ঐতিহাসিক ভাষার লড়াই শুরু হয়। রুশ্নি ভাইয়ের জন্মসময়ের এই ঘটনার ঘনঘটা উত্তরকালে একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর গড়ে ওঠার পেছনে নিশ্চয়ই প্রভাব বিস্তার করে থাকবে। স্কুলে অধ্যয়নকালে তখনকার জেলা ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য করে তাঁকে সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে দীক্ষা দেন। যদিও তিনি বেশিদিন ছাত্র ইউনিয়ন করেননি, পরে ছাত্রলীগে যোগদান করেন; তথাপি ছাত্র রাজনীতির সূচনায় সেই যে সমাজ প্রগতির ছোঁয়া পেয়েছিলেন, সারাজীবন সেই প্রগতিশীল রাজনীতির বৃত্তেই তিনি কাটিয়ে দেন। পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে রুশ্নি ভাই ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। তাঁর পরবর্তী ছোট ভাই ফেরদৌস হাফিজ খান রুমুও একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, তিনি মুক্তিযুদ্ধে ভারতে গিয়ে সি-ইন-সি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে বহু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশগ্রহণ ও কমান্ড করেছিলেন। রুশ্নি ভাই ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে হাটহাজারী পার্বতী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে এসে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম কলেজ তাঁর রাজনীতির সুবর্ণ যুগ। চট্টগ্রাম কলেজে নতুন এক ছাত্রনেতার জন্ম হলো, যাঁর নাম শওকত হাফিজ খান রুশ্নি, যিনি উত্তরকালে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। শওকত হাফিজ খান রুশ্ন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের বিভাগীয় সম্পাদক, ছাত্র সংসদের বার্ষিকী সম্পাদক, চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি, নেতৃত্ব নির্বাচন কমিটি, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি ইত্যাদি তো আছেই। ছাত্রলীগের নিয়ামক নেতৃত্বে আসার পরই তিনি যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সাথে। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ সংগঠনকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে, সে সাথে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাÐে তিনি জড়িত থেকে অল্প সময়েই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন জনপ্রিয় সংগঠক ও নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ছাত্র হিসেবেও শওকত খান রুশ্ন ছিলেন মেধাবী। কিন্তু, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ঠিকমতো একাডেমিক পড়াশোনা না চালিয়ে ব্যাপকভাবে সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিষয়ক পড়াশোনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। শওকত হাফিজ খান রুশ্ন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের কর্মকাÐের সাথেও বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের বুলেটিন-পত্রিকা-লিফলেট ইত্যাদি নিয়মিত প্রকাশনা আর এর সার্বিক খসড়া ইত্যাদি প্রণয়নেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। ছাত্রলীগ সংগঠনের এই প্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন প্রধান ভূমিকায়। চট্টগ্রামের সাহিত্য অঙ্গনেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন তখন হতে। রুশ্নি ভাই একাত্তরের মার্চে চট্টগ্রাম শহরে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে পাহাড়াতলী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গিয়ে ঘাঁটি গড়ে তোলেন। ছাত্রনেতা এস এম ইউসুফ, গোলাম রব্বান, জালালউদ্দিন আহমদও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ছিলেন। কয়েকদিন পর সবাই রামগড়ে চলে যান। রামগড়ের পতনের পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমে সাব্রæম ও পরে হরিণা যান। হরিণা যুব শিবির প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে একপর্যায়ে বিএলএফ গঠিত হলে তিনি এই বাহিনীতে যোগ দেন এবং দেরাদুরের টানডুয়ায় গেরিলা যুদ্ধের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। সেপ্টেম্বরের দিকে তিনি হেডকোয়ার্টার কনটিনজেন্ট নামে নয় সদস্যের একটি গেরিলা দল নিয়ে মিরসরাইতে প্রবেশ করেন। তিনি ছিলেন এই গ্রæপের কমান্ডার এবং ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন ডা. গোফরানুল হক। পরে তিনি আবার হরিণায় ফিরে যান এবং রাউজান থানা বিএলএফ গ্রæপের সাথে রাউজানে যুদ্ধ করতে যান। এ গ্রæপের কমান্ডার ছিলেন নাজিম উদ্দিন খান এবং রুশ্নি ভাই ডেপুটি কমান্ডার। যুদ্ধকালে নাজিম শাহাদাত বরণ করলে রুশ্নি ভাই কমান্ডারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হন। তিনি চট্টগ্রামে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠায় অন্যতম ভূমিকা রাখেন এবং দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম জেলা জাসদের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সফলতার সাথে। পরবর্তীকালে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে এই দল দ্বিধাবিভক্ত হলে তিনি দলীয়ভাবে এর সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন। তবে জাসদ (রব গ্রæপ) এর সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিলো। সদালাপী, বন্ধু বৎসল ও ঈর্ষণীয় সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী রুশ্নি ভাই কর্মক্ষেত্রে ছিলেন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। স্বাধীনতার পর জাসদ নেতা এবিএম নিজামুল হক ও এডভোকেট আবু মোহাম্মদ হাশেম চট্টগ্রাম থেকে ‘দৈনিক দেশবাংলা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করলে রুশ্নি ভাই সেই পত্রিকার ব্যবস্থাপনায় তাদেরকে সহযোগিতা করেন এবং নিজেও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ছিলেন পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, সেই হিসাবে তিনি নিয়মিত উপসম্পাদকীয় কলাম লিখেতেন। তিনি কলাম লিখেছেন ‘সাপ্তাহিক গণরাজ’ পত্রিকায়ও। চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে তিনি কবিতা-প্রবন্ধ লিখতেন নিয়মিত। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকা প্রকাশিত হলে আমার আমন্ত্রণে তিনি পূর্বকোণে ‘মূলধারার অন্বেষণে’ নামে নিয়মিত একটি কলাম লিখতেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দৈনিক পূর্বকোণে ‘মূলধারার অন্বেষণে’ কলাম লিখে গেছেন। রুশ্নি ভাই কাব্য প্রতিভার জন্য ‘সুকান্ত স্বর্ণপদক’ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার জন্য বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র-চট্টগ্রাম কর্তৃক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ এ ভূষিত হন।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ ‘সাহসী ঠিকানা একাত্তর’ এবং তাঁর মৃত্যুর আঠার দিন পর (১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে) ‘সমস্ত সাহস একত্রিত করে বলছি’ কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। আশির দশকের শুরুতে তিনি সাব-রেজিস্ট্রার হিসাবে সরকারী চাকরিতে যোগ দেন। তিনি কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার অন্যতম কর্ণধার ছিলেন। চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি বিজয় মেলা পরিষদের স্মরণিকা সম্পাদক ও কো-চেয়ারম্যান ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। তাঁর সম্পাদনায় বিজয় মেলা পরিষদের তিনটি স্মরণিকা ‘বিজয়’ প্রকাশিত হয়েছে।
রুশ্নি ভাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্তবুদ্ধির চর্চার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি মুসলিম হলের মাঠে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আমার যখন চট্টগ্রামে মাসব্যাপী বইমেলা আরম্ভ করেছিলাম, তারও অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও পরামর্শদাতা ছিলেন তিনি। আমার মনে আছে বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ চৌধুরী হারুনুর রশিদ অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রামে সদরঘাটে তাঁর ভাগ্নী জামাই অধ্যাপক তোফায়েল আহমদের বাসায় সাময়িক আশ্রয় গ্রহণ করলে রুশ্নি ভাই আমাকে, প্রদীপ দেওয়ানজী, কুমার প্রীতিশ বল প্রভৃতি সংস্কৃতিকর্মীকে নিয়ে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ