প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশ ঠকানোর মামলাকে সরকারের হয়রানি বলে সমালোচনা করলেন দেশের ৩৪ বিশিষ্টজন। আদালতে বিচারাধীন মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন তারা।
এদিকে মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকমের কার্যালয় পরিদর্শন করেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের কর্মকর্তারা। তারা সেখানে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের ঠকানোর বেশ কয়েকটি বিষয় খুঁজে পান।
অনিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে স্থায়ী করার কথা থাকলেও তাদের স্থায়ী করা হয়নি। শ্রমিকদের অংশগ্রহণের তহবিল ও কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়নি। এছাড়া কোম্পানির লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের দেওয়ার কথা থাকলেও তা তাদের দেয়া হয়নি। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে এ মামলা করা হয়।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে মামলাটি করেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান। এতে ড. ইউনূসসহ চারজনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইনের ৪- এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলার অন্য আসামিরা হলেন গ্রামীণ টেলিকমের এমডি আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুর জাহান বেগম ও শাহজাহান।
এরইমধ্যে আদালতে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। এর আগে ৮ মে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা বাতিলের আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। আর গত ৬ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। লেবার আইনের ৪ এর (৭) এবং (৮) ধারায় শ্রমিকদের স্থায়ী করা হয়নি এবং ১১৭ ধারায় শ্রমিকদের আর্নলিভ দেওয়া হয়নি। আর ২৩৪ ধারা অনুযায়ী তাদের মুনাফার ৫ শতাংশ দেওয়া হয়নি- এ কারণে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
এই মামলাসহ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক সব পদক্ষেপ ও একতরফা বিষোদগার বন্ধে আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন ৩৪ বিশিষ্টজন। তারা হলেন- অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, হাফিজউদ্দিন খান, হামিদা হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বদিউল আলম মজুমদার, শাহদীন মালিক, শারমীন মুরশিদ, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, অধ্যাপক আলী রীয়াজ, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, শহিদুল আলম, অধ্যাপক সি আর আবরার, অধ্যাপক পারভীন হাসান, অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম, শিরিন হক, রেহনুমা আহমেদ, বিনা ডি কস্টা, অধ্যাপক স্বপন আদনান, অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, রুশাদ ফরিদী, অধ্যাপক আর রাজী, সায়েমা খাতুন, নায়লা জেড খান, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেইন, এম রেজাউল করিম চৌধুরী, সাদাফ নূর, নোভা আহমেদ, রোজীনা বেগম, নাসের বখতিয়ার আহমেদ, মাহবুব মোর্শেদ ও রাখাল রাহা।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রফেসর ইউনুসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা দেওয়ানী মামলায় বিচারযোগ্য হলেও সরকার নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা ফৌজদারি আইনে নিয়ে গেছেন। বিবৃতিদাতা সুশীলদের মধ্যে কয়েকজন প্রখ্যাত আইনজীবী থাকলেও, তারা বলেননি উত্থাপিত অভিযোগের কোন অংশটি ফৌজদারিতে না করে দেওয়ানী আইনে বিচারযোগ্য। বরং তারা প্রফেসর ইউনুসের নোবেল পুরষ্কার এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ সন্মাননা পাবার কথা উল্লেখ করে বলতে চেয়েছেন, এই অর্জনের কারণেই প্রফেসর ইউনুস যা-ই করে থাকুন না কেনো- তা বিচারের ঊর্ধ্বে।
মামলা দায়েরের প্রায় ১১ মাস পর অভিযোগ গঠন হলেও মামলা নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক দ্রুতগতি এবং এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনরা। অথচ আইনজ্ঞরা বলছেন, তিন মাসের মধ্যেই একটি ফৌজদারি মামলার অভিযোগ গঠন হয়ে যাওয়া উচিৎ। সেখানে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সময় আরেকটু বেশি লাগতে পারে। তবে মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য ১১ মাস দীর্ঘ সময়।
আদালতের অভিযোগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন ড. ইউনূস। ২৩ জুলাই মামলায় অভিযোগ গঠন কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। কিন্তু গত ৮ আগস্ট জারি করা রুল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। এরপর চেম্বার আদালতে মামলা বাতিল চেয়ে আবেদন করে আরও সময় ক্ষেপণ করেন তিনি। যদিও গত ২০ আগস্ট মামলায় অভিযোগ গঠন বাতিলে রুল খারিজের বিরুদ্ধে আবেদন খারিজ করে দেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির আপিল বিভাগ। ফলে মামলা চলতে আর কোন বাধা থাকে না।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ আগস্ট মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। হাইকোর্টের একজন আইনজীবী জানান, আপিল বিভাগে ড. ইউনূসের আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় মামলা চলতে এখন আর কোন বাধা নেই। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই সাক্ষ্যগ্রহণসহ মামলার সব কার্যক্রম চলবে। এখানে তাড়াহুড়ো করার আসলে কিছু নেই।
এদিকে ২৭ আগস্ট ইউনূস সেন্টার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। ওবামার বিবৃতিতে ১৭ আগস্ট উল্লেখ করা থাকলেও ইউনূস সেন্টার সেটি প্রচার করে দশদিন পর। অনেকেই বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ার ওপর পরোক্ষে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যেই ইউনূস সেন্টার এমনটা করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন প্রফেসর ইউনুসের নোবেল পুরষ্কার এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ সন্মাননা পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে এনে দেশি বিদেশি একশ্রেণির সুশীল বলার চেষ্টা করছেন- প্রফেসর ইউনুস যা-ই করে থাকুন না কেনো- তা বিচারের ঊর্ধ্বে। কিন্তু বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব আইনে সকল নাগরিকের জন্য আইন সমান- ইচ্ছাকৃতভাবেই সেটি ভুলে গিয়ে শুধু বন্ধুত্ব রক্ষায় ইউনূসের পক্ষে অন্যায্য সাফাই দেয়ার চেষ্টা করছেন।




