নাহিদ উল আলম, চবি প্রতিনিধিঃ (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
বাংলাদেশ তথা বিশ্বের নতুন প্রজাতির মাছ আবিস্কার করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. শাহাদাত হোসেন। আবিস্কৃত নতুন প্রজাতির এই মাছের নাম নান্দুস মেনি (Nandus meni)। এটি নান্দুস গোত্রভুক্ত সপ্তম প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারীজ-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাত হোসেন তার নিরলস গবেষণায় এই প্রজাতির মাছ আবিস্কার করেন। তাকে এই গবেষণা কাজে সহযোগিতা করেন তারই শিক্ষার্থী সুব্রত সরকার।
এ সর্ম্পকে গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারীজ-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারীজ ল্যাবরেটরীতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান মিউজিয়াম অব জুলজি বিশ্ববিদ্যালয়, সিকাগো ফিল্ড মিউজিয়াম অব নেচারেল হিস্ট্রি, র্যাপল মিউজিয়াম অব বায়োডাইভারসিটি রিসার্স ও নাশন্যাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর খ্যাতনামা জীব যাদুঘরগুলোতে রক্ষিত নমূনা সমূহের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণপূর্বক মেনি মাছের এই নতুন প্রজাতি সনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্বের খ্যাতনামা একাডেমিক জার্নাল প্রকাশনা সংস্থা Taylor & Francis (টেইলর এন্ড ফ্রান্সিস) কর্তৃক প্রকাশিত আন্তজার্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী Zoology and Ecology (জুলজি এন্ড ইকোলজি) তে ‘New species of leaf fish Nandus meni (Perciformes: Nandidae) from Noakhali, Bangladesh’ (নিউ স্পাইসিস অব লিফ ফিস নান্দুস মেনি (পারসিফর্মস: নান্দিদাই) ফ্রম নোয়াখালী বাংলাদেশ) শিরোনামে জুলাই ২০১৩ ইং প্রকাশিত হয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞান সূত্রে জানা গেছে, মেনি মাছ Perciformes (পারসির্ফমস) বর্গের অন্তর্গত Nandidae (নান্দিদায়ে) গোত্রভূক্ত Nandus (নান্দুস) পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। বিশ্বে Nandus (নান্দুস) পরিবারের ৬টি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে।
১৮২২ সালে ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন তৎকালীন ভারতবর্ষ হতে Nandus nandus (নান্দুস নান্দুস) প্রজাতিটি সর্বপ্রথম রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার ব্রুনাই অঞ্চল হতে বিভিন্ন সময়ে আরো ৫ টি প্রজাতি সনাক্ত হলেও প্রায় ২০০ বছর পর ২০১৩ সালে বাংলাদেশ হতে ৭ম প্রজাতি হিসেবে Nandus meni (নান্দুস মেনি) সনাক্ত এবং লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে জানা যায়, আঞ্চলিক ভাবে মেনি বা ভেদা মাছ নামে সমধিক পরিচিত নতুন এই প্রজাতির Nandus meni (নান্দুস মেনি) নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার জলাভূমি হতে সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও নদী, খাল, পুকুর, জলাবদ্ধ ধানক্ষেত এবং প্লাবনভূমিতে এর বিস্তৃতি রয়েছে। এই মাছ পানির উপরিস্তরে বসবাস করে এবং শৈবাল, পোকামাকড় ও ছোট মাছ খেয়ে জীবন ধারণ করে।
বর্ষাকাল এই মাছের প্রজনন ঋতু। মেনি মাছের বর্ণ সবুজ, গায়ে অনিয়মিত আকৃতির কালো দাগ রয়েছে। মাছটির শরীর চ্যাপ্টা আকৃতির, মুখ অত্যন্ত প্রশস্থ, পৃষ্ঠীয় অঞ্চল অর্ধচন্দ্রাকৃতির এবং বক্ষীয় অঞ্চল অবতলাকৃতির। মাছটি ৫-৬ ইঞ্চি লম্বা ও ২-২.৫ ইঞ্চি চ্যাপ্টা আকারের হয়ে থাকে এবং ওজন হয় ৫০-৭৫ গ্রাম। অর্থাৎ ১৫-২০ টিতে এক কেজি হয়।
মেনি মাছ সহজেই জেলেদের জালে ধরা পড়ে। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং স্থানীয় অথবা শহরের বাজারে এই মাছের বেশ কদর রয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম কাটাযুক্ত হওয়ায় ভাজি এবং রান্না উভয় ক্ষেত্রেই খাদ্য তালিকায় এর উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। নোয়াখালী অঞ্চলে বছরে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন মেনি মাছ উৎপন্ন হয়ে থাকে যার বাজার দর কেজি প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা। এই প্রজাতিভূক্ত মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে চাষাবাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ড. শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ জলাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ জীববৈচিত্রের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনও করা সম্ভব হয়নি। যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে আরও নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন গবেষকরা।




