ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
যশোরের সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল হত্যার ১৩ বছরেও বিচার হয়নি নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের। আইনের মারপ্যাঁচে গত ৮ বছর ধরে আটকে আছে এ মামলার বিচারকাজ। যশোরের সাংবাদিক সমাজ এই হত্যা মামলাটির পুনঃতদন্ত শেষে দ্রুত বিচার নিস্পত্তির দাবি জানিয়ে আসলেও এ নিয়ে কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। মামলার এমন দীর্ঘসূত্রীতায় ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবারও।
সাংবাদিক শাসছুর রহমান ২০০০ সালের ১৬ জুলাই জনকন্ঠের যশোর অফিসে কর্মরত অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন।
এ হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে) দিনব্যাপি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মঙ্গলবার সকালে শহরের কারবালা কবরস্থানে শহীদের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্মরণসভা।
নিহতের সহোদর সাংবাদিক সাজেদ রহমান জানান, ২০০১ সালে সিআইডি এই মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। এরপর বিগত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক আসামির আগ্রহে মামলার বর্ধিত তদন্ত করে শামছুর রহমানের ঘনিষ্ট বন্ধু সাংবাদিক নেতা ফারাজী আজমল হোসেনকে নতুন করে আসামি করা হয়। এসময় মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্টজনদেরকে। এতে একদিকে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়; অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশিট। এরপর বিতর্কিত ওই বর্ধিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার চার্জ গঠন করা হয়।
ওই বছরের জুলাই মাসে বাদীর মতামত ছাড়াই গোপনে মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় মামলার বাদী শহীদ শামছুর রহমানের সহধর্মিণী সেলিনা আকতার লাকি বিচারিক আদালত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলে তিনি বলেন, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিরক পলাতক রয়েছে। সেসহ সংশ্লিষ্ট মামলার অন্যান্য আসামির সাথে খুলনার সন্ত্রাসীদের সর্ম্পক রয়েছে। ফলে তার (বাদীর) পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষী দেয়া জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাদীর এই আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটি ‘কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে না’ তার জন্য সরকারের উপর রুলনিশি জারি করেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে রুলনিশির জবাব না দেয়ায় মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
উল্লেখ্য, এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছে। আরেক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র্যাবের ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু হৃদরোগে এবং যশোর সদরের চুড়ামনকাটির আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছেন। বাকী আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
এদিকে দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় পুরনো বিতর্কিত তদন্ত বাতিলপূর্বক মামলাটি পুণঃতদন্তের।
শামছুর রহমানের সহধর্মিণী সেলিনা আখতার লাকি জানান, ‘১৩ বছর ধরে কত কথাইতো বলেছি। কত চোখের পানি ফেলেছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে স্বামী হত্যার বিচারের জন্য আকুতি জানিয়েছি। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে গেল, কোন কিছুইতো হলোনা। তাই এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা। কারণ একই কথা বারবার বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি’।
যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাকিরুল কবির রিটন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শামছুর রহমান কেবলের মত অকুতোভয় সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার ১৩ বছরেও হবে না, এটা মেনে নেয়া যায় না। তিনি সকল সাংবাদিক হত্যার বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান।
যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর এজেডএম ফিরোজ জানান, মামলায় অভিযুক্ত একজনের হাইকোর্টে রিটের জন্য বর্তমানে বিচারকাজ স্থগিত হয়ে আছে। তবে রাষ্ট্র যদি তৎপরতা দেখায় তাহলে মামলাটির বিচারকাজ শেষ হতে পারে।




