শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনআ. লীগের দ্বন্দ্বে ভেস্তে গেল ছাত্রলীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া

আ. লীগের দ্বন্দ্বে ভেস্তে গেল ছাত্রলীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া

চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা ও সাংসদদের পছন্দ-অপছন্দের কারণে শেষতক জেলা ছাত্রলীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেল। জেলা ছাত্রলীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষনেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের শীর্ষনেতাদের একটি তালিকা প্রদান করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা, সাংসদদের পছন্দ-অপছন্দ ও চাহিদা মেটানোর দ্বন্দ্বের কারণে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি শেষতক পুনর্গঠন অনুমোদন করেননি। এতে হতাশ হয়ে চট্টগ্রাম ফিরেন ছাত্রলীগ নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে আগে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। জেলা ছাত্রলীগের কার্যক্রমে গতিশীল ও পুনর্গঠন করতে নিয়মিত ছাত্র ও বয়সসীমার মধ্যে থাকা ছাত্রদের নিয়ে শিগগিরই জেলা সম্মেলন করার মত প্রকাশ করেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের তালিকা প্রকাশ ও পুনর্গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখন আর কথা হয়নি।

২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল আবদুল মালেক চৌধুরী জনিকে আহবায়ক ও সালাউদ্দিন সাকিব, নুরুল আমিন, ফরহাদুল আলম, মহিউদ্দিন মহি এবং আবু জাহেদকে যুগ্ম আহবায়ক করে ছয় সদস্যের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদ। কমিটি ঘোষণা পর থেকে ছয়জন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। এরফলে ছাত্রলীগের কার্যক্রমে নেমে আসে স্থবিরতা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ১০ মাসের মাথায় খুন হন আহবায়ক আবদুল মালেক জনি। গত ৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ দলীয় কার্যালয়ে ছাত্রলীগের একাংশের হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। জনি হত্যাকান্ডের পর জেলা ছা্ত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে নেমে আসে হতাশা ও ক্ষোভ। এতে ঝিমিয়ে পড়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

জনি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত চার ছাত্রলীগনেতা হল : কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য আবু সাদাত মো. সায়েম, দক্ষিণ জেলার যুগ্ম-আহবায়ক  আ ন ম ফরহাদুল আলম, মহিউদ্দিন মহি, আবু জাহেদ। ফলে জেলা ছাত্রলীগের ছয় সদস্যের মধ্যে একজনের মৃত্যু ও তিন জনের বহিষ্কারে দুইজনে দাঁড়ায়। দুই সদস্য দিয়ে ৬ মাস ধরে চলে আসছে জেলা ছাত্রলীগ। এতে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের অবস্থা নাজুক ও স্থবিরতা নেমে আসে।

স্থবিরতা কাটাতে জেলা ছাত্রলীগকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এ জন্য জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের মতামত গ্রহণ করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের কাছ থেকে একটি তালিকা নেয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। ৩১ সদস্যের কমিটি ঘোষণার প্রস্ত্ততি নেয়া হয়। কমিটির মধ্যে বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহবায়ক সালাউদ্দিন সাকিবকে আহবায়ক ও নুরুল আমিনকে যুগ্ম আহবায়ক ঠিক রেখে আর চারজনকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩১ সদস্যের কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়। জেলা আওয়ামী লীগের তালিকার সাথে ছাত্রলীগের মতামত নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পুনর্গঠিত কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা ছিল। সেই লক্ষ্যে জেলা ছাত্রলীগের সবেধন নীলমনি দুই যুগ্ম আহবায়ককে কেন্দ্রে তলব করে। গত দুইদিন ধরে তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। শেষতক জেলা আওয়ামী লীগ ও সাংসদদের দ্বন্দ্ব, পছন্দের পদের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদ। শেষতক আলোর মুখ দেখেননি ছাত্রলীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। এতে তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা নেমে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জেলা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে ঢাকায় তলব করার কথা স্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক সালাউদ্দিন সাকিব ও যুগ্ন আহবায়ক নুরুল আমিন গতকাল রাতে বলেন, জেলা ছাত্রলীগের কার্যক্রমকে চাঙ্গা, গতিশীল ও ২ মাসের মধ্যে সম্মেলন করার নির্দেশনা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেলার আওতাধীন উপজেলা, পৌরসভা ও সরকারি কলেজগুলোর সম্মেলন করারও নির্দেশনা দেনা তারা।

জেলা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আওয়ামী লীগের চাপে ছাত্রলীগের জেলা কমিটি ঘোষণার ২৫ মাসেও ইউনিট সম্মেলন শুরু করতে পারেনি।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে আহবায়ক কমিটি ঘোষণা তিন মাসের মধ্যে সম্মেলন করার নিয়ম রয়েছে। আহবায়ক কমিটির আকার হবে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট। গত বছরের ডিসেম্বরের জেলা ছাত্রলীগ ৩১ জনের নাম কেন্দ্রীয় সংসদের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাল্টাপাল্টি তালিকা জমা দেয়ার কারণে কমিটির আকার পূর্ণতা পায়নি। অথচ দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬ অনুচ্ছেদের (ক) ধারায় আহবায়ক কমিটি গঠনের তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার বিধান রয়েছে। অন্যথায় আহবায়ক কমিটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে।

জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। সভাপতি ছিলেন আবদুল কাদের সুজন ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টিপু সুলতান। এরপর থেকে কেন্দ্র চাপিয়ে দেয়া আহবায়ক কমিটি দিয়ে চলে আসছে ছাত্রলীগের কার্যক্রম।

দীর্ঘদিন ধরে জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন না হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে না নতুন নেতৃত্ব। জেলা কমিটির আওতাধীন উপজেলা, পৌরসভা, থানা ও কলেজ কমিটির অবস্থাও তথৈবচ। তবে জেলা আহবায়ক কমিটি কর্ণফুলী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা কমিটি ঘোষণা করলেও বিপত্তি বাধে। অন্যপক্ষ পাল্টা কমিটির প্রস্ত্ততি নেওয়ার সময় বেঁধে যায় লঙ্কাকান্ড। মারা যান জেলা আহবায়ক জনি। তবে লোহাগাড়ায় বিবদমান পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণা করলে কেন্দ্রীয় সংসদ তা স্থগিত করে। ১০-১৫ বছর ধরে কয়েকটি ইউনিট সম্মেলন হচ্ছে না। তালিজোড়া দিয়ে চলছে দলীয় কার্যক্রম।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান কে বলেন, কেন্দ্র থেকে কমিটি নাজিলের যে ট্রেডিশন শুরু হয়েছে, তাতে ছাত্র সংগঠনের সৃজনশীলতা ও যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। এতে ছাত্র রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও নতুন নেতৃত্ব বিকশিত হবে।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে এ বিষয়ে আগে আলাপ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির সাথে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে শলা-পরামর্শ করেই জেলা সম্মেলনের জেলা ছাত্রলীগকে পুনর্গঠন করে শক্তিশালীর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন না হওয়ায় দলে স্থবিরতা নেমে এসেছে। এর উত্তরণ ঘটাতে দ্রুত সম্মেলন শেষ করতে হবে।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, দুই মাসের মধ্যে সকল ইউনিট সম্মেলন শেষ করে জেলা সম্মেলন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ