আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির নজর এবার দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। বাংলাদেশ তো বটেই; সেই সঙ্গে ভারত, মিয়ানমারেও শাখা খোলার কথা জানিয়েছেন তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গত বুধবার আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির একটি ভিডিও বার্তা অনলাইনে পোস্ট করা হয়। তাতে জাওয়াহিরি আল-কায়েদার ভারতীয় শাখা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটা বাংলাদেশ, মিয়ানমার, আসাম, গুজরাট, আহমেদাবাদ ও কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্য ‘আনন্দের খবর’। আল-কায়েদার নতুন এই শাখা এ অঞ্চলের মুসলমানদের ‘অবিচার ও আগ্রাসন’ থেকে উদ্ধার করবে।
এদিকে, এই ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, এটি আসল না নকল তা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে। তিনি আরও বলেন, ভিডিও কোথা থেকে কিভাবে আসল তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। এরপর দুই একদিনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করবো। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার আগেও জঙ্গি দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের এ চেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি, র্যাব সতর্ক রয়েছে। বার্তাটি খতিয়ে দেখতে র্যাব কাজ শুরু করে দিয়েছে।
মূলত, ভারতীয় উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার শাখা খোলার আয়মান আল জাওয়াহিরির ঘোষণাকে বাংলাদেশের সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ঢাকার গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য, ২০০২ সালে আয়মান আল জাওয়াহিরি গোপনে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। চট্টগ্রামের লালখান বাজারের একটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় দু’দিন বাংলাদেশে অবস্থান করে পাকিস্তান ফিরে গিয়েছিলেন এই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি নেতা। সে সময়কার প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা গোপনে জাওয়াহরিকে নিরাপত্তা দিয়েছে। এ খবরটি তদানিন্তন খালেদা জিয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌছানোর আগেই চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন আল-কায়েদার এ নেতা। গত বছর চট্টগ্রামের ওই মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে তিনজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন।
বুধবার অনলাইনে পোস্ট করা ৫৫ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় আরবি ও উর্দু ভাষার মিশ্রণে জাওয়াহিরি বলেন, এই পদক্ষেপ ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী আইনের প্রসার ও জিহাদের পতাকা সমুন্নত রাখবে। এরই মধ্যে ভারতে সংগঠনের আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন জাওয়াহিরি। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের গোয়েন্দা ব্যুরো (আইবি) সমগ্র ভারতে রেড এলার্ট জারি করেছে। ভারতের গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, আল-কায়েদার এ ঘোষণা অপ্রত্যাশীত নয়। কারণ আল-কায়েদা ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। সুতরাং আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গিবাদের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা আল-কায়েদার জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা নতুন নতুন এলাকা শাখা খুলে তাদের আওতা বৃদ্ধি করতে চাইছে।জাওয়াহিরির এই ঘোষণার পর ভারতের গোয়েন্দা ব্যুরো দেশের সমস্ত থানাকে সতর্ক করে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ গোয়েন্দা বিভাগকে ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এর উৎস সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছেন।আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানে মার্কিন কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয়। আল কায়েদা দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিম ভূখন্ডগুলোতে একক খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধরত জিহাদিদের নেতৃত্ব দাবি করে আসছে।ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুও পর সংগঠনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি আল কায়েদা প্রধান হন। তবে আল-কায়েদা বা অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছে লাদেনের মত জাওয়াহিরি তেমন উজ্জ্বল নন। বেশ কয়েক বছর ধরে পরবর্তী নেতা হিসেবে জাওয়ারির ভূমিকার প্রবল সমালোচনা হচ্ছিল জঙ্গিমহলে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
ইরাকে মার্কিন সেনার অবস্থানের সময়ে সেখানে আল-কায়েদার শাখা তৈরি হয়। এর এক নেতা ছিলেন আবু বকর আল-বাগদাদি। তিনি মার্কিন সেনার হাতে ধরা পড়ে কয়েক বছর গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ইরাকে নতুন করে আল-কায়েদার সংগঠন গড়ে তুলতে শুরু করেন আল-বাগদাদি। ফলে তার সঙ্গে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরোধ শুরু হয়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এই বিরোধ প্রবল হয়। এরইমধ্যে ইসলামিক স্টেট নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে এবং আল বাগদাদিকে তাদের নেতা বলে উল্লেখ করা হয়। আল-বাগদাদি নিজেকে মুসলমানদের খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা এবং বিশ্বের সব মুসলমানকে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের দাবি করেন। আইএস-এর নৃশংস কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে জাওয়াহিরি-সহ আল-কায়দার শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের সমালোচনা করতে শুরু করে। ফলে আইএস-এর সঙ্গে আল-কায়দার সম্পর্কই শুধু ছিন্ন হয় না, সিরিয়ার কয়েকটি জায়গায় দু’দলের জঙ্গিরা সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে।
জিহাদের বিষয়ে আল-কায়েদার ‘নরম মনোভাব’-এর নিন্দা করে আইএস তাদের থেকে সরে আসে। এর পর সিরিয়ার পূর্ব ও ইরাকের পশ্চিম দিকের একটি বড় অংশ আইএস-এর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শুধু সিরিয়া ও ইরাক নয়, এর মধ্যেই আফগান জঙ্গিদের একাংশও ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে। এই নিয়ে পাক-আফগান সীমান্তের দুর্গম আদিবাসী অঞ্চলে প্রচারও চলছে বলে জানা গিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আল জাওয়াহিরির ভিডিওটি প্রকাশ করা হল। ভিডিওতে মায়ানমার, বাংলাদেশ এবং ভারতের আসাম, গুজরাট, আহমেদাবাদ ও কাশ্মীরের মুসলমানদের ওপর অবিচার ও তাদেরকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ‘কায়েদাত আল-জিহাদ ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ স্থাপনের কথা জানাল জাওয়ারি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এরই মধ্যে ভারত থেকে বেশ কিছু যুবক আইএসে যোগ দিয়ে সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধ করছে। কয়েক জন প্রাণও হারিয়েছে। ফলে আসাম, গুজরাট, আহমেদাবাদ ও কাশ্মীরের মতো এলাকা থেকে যুবকদের নিজেদের দলে টানতে আল জাওয়াহিরি এই পদক্ষেপ নিতে পারেন। ভিডিওটিতে আইএস এর নাম সরাসরি উলেস্নখ করা না হলেও ইরাক ও সিরিয়ায় দখলকৃত অংশে আইএসএর শাসনকার্য চালানোর প্রচেষ্টা সম্পর্কে কৌশলী কথাবার্তা বলা হয়েছে। জাওয়াহিরি বলেন, নিজেদের জিহাদি মনে করলে কোনও জঙ্গি সংগঠনকে রাষ্ট্র স্থাপন ও পরিচালনা করার মতো কাজ থেকে সরে আসা উচিত। তিনি আল-কায়েদার নতুন শাখাকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার চালাতেও নিষেধ করেন। একই সঙ্গে অন্য জিহাদিদের নিন্দা না করে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলিকে একই সঙ্গে কাজ করার ডাকও দিয়েছেন।




