চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
গত পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনের পর দেশি-বিদেশি চাপে রীতিমতো কোনঠাসা জামায়াতে ইসলাম। এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যতগুলো রায় হয়েছে তার আগে ও পরে জামায়াত সহিংস কর্মসূচি নিলেও ব্যতিক্রম দেখা গেল ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়কে ঘিরে। রায় দেয়ার পরও জামায়াতের এই অস্বাভাবিক ‘নিরবতা’ অনেককেই অবাক করেছে।অস্ত্র মামলায় দলের আমিরের ফাঁসির রায়ের পর হরতাল অবরোধতো দূরের কথা একটি বিবৃতি দিয়েও নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দিতে দেখা গেলনা জামায়াতকে।রায়ের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে কানাঘুষা শুরু হয়েছে যে, জামায়াতের এই ‘নিরবতা’ কি তাহলে জামায়াতের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সঙ্কটেরই ইঙ্গিত!নাকি রায় তারা মেনে নিয়েছে!
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিভিন্ন সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংস কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। প্রত্যেকটি রায় ঘোষণার দিন এবং পরের দিন থেকে টানা হরতাল কর্মসূচিও পালন করে জামায়াত। ওইসব কর্মসূচিতে দেশজুড়ে ব্যাপক নাশকতা চালায় দলটি।
বিশেষ করে, জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর রায় ঘোষণার দিন থেকে জামায়াতের টানা তান্ডব চালায় দেশজুড়ে। ওই সহিংসতায় সারাদেশে ৭০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়।এরপর আরেক নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি রায় কার্যকর হওয়ার পরও কর্মসূচি দিয়েছিল জামায়াত। সেসময়ও রাজাধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা।
কিন্তু বৃহস্পতিবার অস্ত্র মামলায় দলটির আমিরের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পরে প্রথমবারের মতো ‘নিশ্চুপ জামায়াত। দুপুর ১২টায় রায় ঘোষণা হলেও সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দলটি কোন বিবৃতি দেয়নি।তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও এবিষয়ে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি। জামায়াতের এমন অবস্থান নিয়ে তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির এবং কর্মী সমর্থকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এ নিরবতায় ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান থেকে শুরু করে বিএনপি এড়িয়ে চলা,বিদেশে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে পরিচিত লাভ,সরকারের কঠোর মনোভাবের কারনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে স্বাধীনতাবিরোধী এ দলটি। বিশেষ করে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে উল্লেখ করারয় অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে দলটি।
এ ছাড়া ভেতরে ভেতরে বিএনপির সঙ্গেও বড় একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জামায়াতের একটি পক্ষ বলছে, এই মুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকে কোনো লাভ হবে না। তারা মনে করছে বিএনপি ক্ষমতার জন্যই জামায়াতকে জোটে নিয়েছে। প্রয়োজন শেষ হলে জামায়াতকে জোট থেকে বের করে দিতে পারে। আর এতে জামায়াত ও শিবির রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তবে অন্য পক্ষটি চাইছে ভবিষ্যত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে গেলে তাদের প্রধান মিত্র বিএনপির পাশেই থাকতে হবে।
নাম না প্রকাশের শর্তে জামায়াতের এক নেতা বলেন, ‘আমাদের দলে কোন বিরোধ নেই। সাংগঠনিকভাবেই আমরা শক্তিশালী অবস্থানেই আছি । কর্মসূচি ডাকলে তা পালনে আমরা শতভাগ সফল। দলের কেন্দ্রীয় কমান্ড আপাতত কোনো কর্মসূচি দিতে চাইছে না।’
যুদ্ধাপরাধ মামলায় রায় ঘোষণার সময় কর্মসূচি দিয়েছেন, কিন্তু দলের আমিরের বিরুদ্ধে ফাঁসি আদেশ হওয়ার পরেও কোন কর্মসূচি নেই কেন- এ প্রশ্নের জবাবে ওই নেতা বলেন, ‘কর্মসূচি ঘোষণার অনেক সময় আছে। রায় ঘোষণা হয়েছে মাত্র- এ বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল করা হবে। তাই দল সবার সঙ্গে আলোচনা করেই কর্মসূচি দেবে।’
তবে এটাকে দলটির অস্তিত্ব সংকট হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ‘জামায়াত কর্মসূচি ডাকলেই সহিংসতা চালায়। সেকারণে তাদের কর্মসূটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর। তবে বহুল আলোচিক দশট্রাক অস্ত্র মামলায় নিজামীর রায় ঘোষণার পর জামায়াতের অবস্থান তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।’ আবার কেউ কেউ বলছে, জামায়াতের এই অবস্থান দিয়ে রায় মেনে নিয়েছে কিনা তাও ভাবার সময় এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ ম রেজাউল করীম বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত নেতাদের রায় ঘোষণার সময় থেকে জামায়াত যে সহিংসতা চালিয়েছে- সেটা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশ প্রশাসনও তাদেরকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এছাড়া বিভিন্ন সহিংসতার মামলায় দলের শীর্ষ নেতারা আসামি থাকায় দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থা তাদের নেই।’
দলের আমিরের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা হয়েছে; এরপরেও কর্মসূচি নিয়ে ‘চিন্তিত’ জামায়াত- এ রাজনৈতিক কৌশল কিনা, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়ন এই আইনজীবী বলেন, ‘আমিতো মনে করি কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজপথে সহিংসতা চালানো মতো শক্তি নেই স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটির। দেশজুড়ে সহিংসতা চালাতে চালাতে এথন তারা সাংগঠনিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটাকে কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’




