রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা

মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা

অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণিত ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিনেন্স’ সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমানে পুনর্গঠনাধীন সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর ওপর সাবেক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে।

সংশোধনীটি বিশেষভাবে পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—যেগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের অংশ হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত করা হচ্ছিল।

শুক্রবার সংসদে পাস হওয়া নতুন বিধান অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে তাদের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় অধিগ্রহণ করতে পারবেন। এতে নবগঠিত সম্মিলিত ব্যাংক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংকটাপন্ন পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। নতুন এই সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি ব্যাংক খাত সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করছে এবং আর্থিক সংকটের জন্য দায়ীদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

১৮ক ধারা সংযোজনের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি সংশোধন করেছে সরকার। এই ধারায় বলা হয়েছে, রেজোলিউশনের তালিকাভুক্ত কোনো ব্যাংকের আগের মালিকরা ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃঅধিগ্রহণের জন্য রেজোলিউশন কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।

তবে সেই পথ শর্তসাপেক্ষ। আবেদনকারীকে আলাদা অঙ্গীকারনামায় বলতে হবে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন দেবে, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে, আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব দেবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।

এছাড়া আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। সিদ্ধান্ত জানানো হলে তিন মাসের মধ্যে আগের জমা দেওয়া অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে। এরপর বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয় তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা ধরা পড়লে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।

পুরনো মালিকদের ফিরতে হলে আবেদনের সঙ্গে আলাদা একটি অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। এতে উল্লেখ করতে হবে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন যোগান দেবে এবং বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।

এছাড়া তারা আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।

আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নেবে। আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের তিন মাসের মধ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে। এরপর একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয়টি তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা ধরা পড়লে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্যোগকে “ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষা”র দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে একে ‘মার্কেট সলিউশন’ বা ‘বাজারভিত্তিক সমাধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদে বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং সামনে আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন।

তার ভাষায়, নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদেরই মূলধন পুনঃস্থাপন, দায় পরিশোধ এবং আগে দেওয়া সহায়তা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। ফলে সরকার বা আমানত সুরক্ষা তহবিলের ওপর চাপ কমবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনর্গঠন করে দ্রুত কার্যক্রম চালু করা গেলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক হবে।তিনি আরও বলেন, “মালিকানা পুনর্বহালের সুযোগ দিলে নির্দোষ সাধারণ শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হবে। এটি ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি এটিকে ‘বাজারভিত্তিক সমাধান’ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, সরকারি হস্তক্ষেপের বদলে বেসরকারি উদ্যোগ ও পুঁজি সংযোজনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থমন্ত্রী জানান, এই নতুন ব্যবস্থা শুধু আগের শেয়ারধারীদের জন্য নয়; বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষও এতে আবেদন করতে পারবে। সম্পদের মূল্য সংরক্ষণের যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “সরাসরি লিকুইডেশনে গেলে সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ব্যাংক সচল রেখে পুনর্গঠনের সুযোগ থাকলে সম্পদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই সংরক্ষণ করা সম্ভব।”

এছাড়া, কর্মসংস্থান নিয়ে বলেন তিনি, ব্যাংক সচল থাকলে কর্মচারীদের চাকরি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রমও চালু থাকবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক খাত সংস্কারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্য ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচটি ব্যাংক রেজোলিউশনের মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাজ চলছিল। একীভূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক উন্নয়ন সহযোগীর সম্পৃক্ততাও ছিল। এখন নতুন ধারা যুক্ত করে বিল পাস করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আগের মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক টিকবে না।”

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা যদি শর্ত অনুযায়ী ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেয় এবং পরবর্তী দুই বছরে বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধে রাজি হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

তিনি আরও বলেন, “যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ হবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রথম তিন মাসের মধ্যে দিতে হবে এবং বাকি অর্থ পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করতে হবে। এমন সহজ শর্তে আগের মালিকরা অবশ্যই তা বাস্তবায়নে রাজি হবে।”

জাহিদ হোসেন বলেন, “পুরনো মালিকরা এখন ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থ ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারবে।”

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক টিকবে কি না—এমন প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, আগের মালিকরা বা নতুন যারা পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানায় আসবে, তাদের সিদ্ধান্তের ওপরই ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

তিনি বলেন, “তারা যদি মনে করেন আগের মতো পাঁচটি ব্যাংক আলাদাভাবে পরিচালনা করবেন, তাহলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আর টিকবে না। আর যদি সবাই মিলে একটি ব্যাংক হিসেবে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটি টিকে থাকতে পারে।”

এ ধারাতেই পুরনো শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষের জন্য পুনঃধারণ বা ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন, অধ্যাদেশে থাকা স্বেচ্ছায় অবসায়নের পূর্ণাঙ্গ আলাদা অধ্যায় কার্যত বাদ গেছে। অধ্যাদেশে ৭১ থেকে ৭৬ ধারায় তফসিলি ব্যাংকের স্বেচ্ছায় অবসায়নের আবেদন, লাইসেন্স প্রত্যাহার, দায় পরিশোধ ও রেকর্ড নিবন্ধনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া ছিল। বিলে তা সঙ্কুচিত হয়ে এক লাইনের ৫২ ধারায় এসেছে। সেখানে শুধু বলা হয়েছে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কোনো তফসিলি ব্যাংক স্বেচ্ছায় অবসায়ন করতে পারবে।

তৃতীয়ত, অধ্যাদেশের একাধিক জায়গায় থাকা ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০’-এর রেফারেন্স বদলে বিলে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ করা হয়েছে। সুরক্ষিত আমানত, আমানত সুরক্ষা তহবিল ও সুরক্ষিত আমানতকারীর সংজ্ঞাতেও এই পরিবর্তন এসেছে।

চতুর্থত, ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল-সংক্রান্ত অংশও সঙ্কুচিত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে কাউন্সিলের গঠন, সভা, গোপনীয়তা, টেকনিক্যাল কমিটি ও সচিবালয় নিয়ে আলাদা একাধিক ধারা ছিল। বিলে সেগুলো অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত আকারে আনা হয়েছে।

পঞ্চমত, কিছু জায়গায় ভাষাগত ও কাঠামোগত রূপান্তর এসেছে। যেমন অধ্যাদেশে ‘পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক’ পরিভাষা ছিল, বিলে তা ‘সিস্টেমিক দিক হইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক’ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পরিভাষা বদলালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল ক্ষমতা ও নীতিগত কাঠামো বহাল আছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ