সোমবার, জুন ১৭, ২০২৪
প্রচ্ছদইন্টারভিউরেড ক্রিসেন্টকে এমন জায়গায় নিতে হবে যেন সবাই মনে রাখে : অধ্যাপক...

রেড ক্রিসেন্টকে এমন জায়গায় নিতে হবে যেন সবাই মনে রাখে : অধ্যাপক ডা. কবীর চৌধুরী

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী। তিনি আন্তর্জাতিক মানের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ২০০৪ সালে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শমরিতা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত চিকিৎসক। চিকিৎসা শাস্ত্রে অনন্যসাধারণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে পেয়েছেন চিকিৎসাবিদ্যায় স্বাধীনতা পুরস্কার। সম্প্রতি তিনি জাতীয় দৈনিক কালবেলায় একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সাক্ষাৎকারটি আমাদের পাঠকদের জন্য হুবহু প্রকাশ করা হলো

প্রশ্ন: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন। প্রথমেই আপনার কাছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেড ক্রস কিংবা রেড ক্রিসেন্টের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনে ২৮ এপ্রিল আমি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এর মধ্য দিয়ে আমার কর্মযাত্রার শুরু। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১৮৬৩ সালে রেড ক্রিসেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯৯ সালে জাতীয় সোসাইটিস আইসিআরসি এবং ফেডারেশন পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে একে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলা হয়। ভারত, পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশে বাংলাদেশ রেড ক্রস নামকরণ হয়।

প্রশ্ন: আমরা জানি, বিভিন্ন দুর্যোগে রেড ক্রিসেন্ট অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক সময়ে এ সংস্থা কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: যে সময়টা দুর্যোগকালীন নয়, সে সময়ে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের সংঘটিত করা হয়। নিজেকে কীভাবে দুর্যোগ অবস্থা থেকে নিরাপদ রাখতে হবে, বিপদগ্রস্তকে কীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতে হবে। সারা দেশে আমাদের অনেক ব্লাড ব্যাংক ইউনিট রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। মানুষরা যাতে ব্লাড ডোনেট করেন এজন্য তাদের উদ্বুদ্ধও করা হয়। এভাবেই বছরজুড়ে নানা কর্মকাণ্ড আমাদের থাকে।

প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কী ধরনের ভূমিকা পালন করে?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: ‘অধুনা’ নামে একটি চলমান প্রক্রিয়া রয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে ফিলিস্তানি দূতাবাসের হাইকমিশনারের মাধ্যমে আমরা গাজায় মানবিক সহায়তাস্বরূপ সামান্য আর্থিক সহযোগিতা করেছি। আগামীতেও ‘অধুনা’র একটি সভা রয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের সহযোগিতা করার ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া গাজায় আমাদের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক যারা রয়েছেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। অন্যান্য দেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি গাজায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

প্রশ্ন: ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর নিপীড়নে নারী, শিশুসহ বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নাগরিক হতাহত হচ্ছে, বাড়িছাড়া হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তাদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর যে নিপীড়ন চলছে সেখানে নারী, শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের আর্থিক সহায়তা সেভাবে বেশি না হলেও তারা খুশি হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের আরও সহায়তা আমরা করব।

প্রশ্ন: প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সংকট এখন আরও তীব্র হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় রেড ক্রিসেন্ট কোনো ভূমিকা রাখছে কি?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: এখন তাপপ্রবাহ চলছে। আমাদের দেশে আমরা যেটিকে বলি উষ্ণপ্রবাহ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষদের তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচাতে টুপি, ছাতা, পানি, খাবার স্যালাইন বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। বেশিক্ষণ রোদে না থাকা, মাথা ঘোরালে স্থানীয় হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। কারণ মাথা ঘোরানো তাপপ্রবাহের এটা উপসর্গ। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের সহযোগিতা করছে যাতে তাপপ্রবাহের কারণে কোনো ব্যক্তি মারা না যান।

প্রশ্ন: রেড ক্রিসেন্ট একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। কিন্তু সম্প্রতি এর সম্পদ ও তহবিলের অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা রোধ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন বা নিয়েছেন?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: এখানে যোগদানের পর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নানা অনিয়মের কথা আমিও শুনেছি। প্রতিবেদনও দেখেছি। প্রত্যেক বিভাগের পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের বিভাগে কতজন লোকবল আছে তা জানানো। কোথা থেকে টাকা প্রতিষ্ঠানে আসছে, কোন কোন খাতে টাকা খরচ হচ্ছে সেটিও জানাবেন। হিসাবরক্ষকের কাছেও প্রতিটি বিভাগের হিসাবের তথ্য দিতে বলেছি। তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে কোথায় কোথায় অনিয়ম হয়েছে তা জানার চেষ্টা করব। অনিয়মগুলো চিহ্নিত করে রেড ক্রিসেন্টের দুর্নামগুলো ঘোচানোর চেষ্টা করব।

প্রশ্ন: রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনার কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: রেড ক্রিসেন্টের কার্যক্রমকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা। রেড ক্রিসেন্ট বিশ্বের অন্যতম একটি মানবতা সেবা প্রদান প্রতিষ্ঠান। সারা বিশ্বে পরিচিত করে তোলা যেন আমাদের দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশ্বের সব রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং জনগণ আমাদের সহযোগিতা করে। এককভাবে আমাদের দেশে আরও কাজ করতে পারে। আমরা যাতে ভালো কাজ করতে পারি এজন্য আমাদের সংস্থাকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাব। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টকে এমন জায়গায় নিতে হবে যেন সবাই মনে রাখে মানবসেবার প্রথম সংগঠন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।

প্রশ্ন: সারা দেশে রেড ক্রিসেন্টের সাত লাখের বেশি স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। দুর্যোগকালীন সময় ছাড়াও তাদের কীভাবে কাজে লাগানো যায়, এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: সাত লাখ স্বেচ্ছাসেবককে বিভিন্ন ফিল্ডে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবছি। প্রাথমিক সেবা প্রদান প্রশিক্ষণ, সবাইকে একটি করে গাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করা। সবুজায়নে ভূমিকা রাখতে শুধু সে একা নয়, তার পরিবারের সদস্যরাও ভূমিকা রাখতে পারে। একই পরিবার তিনটি গাছ লাগালে ২১ লাখ গাছ লাগানো সম্ভব হবে। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ত্বকের ক্ষতি হয়—এ ব্যাপারে যদি কিছু বলেন। কীভাবে এ থেকে নারী-শিশু-পুরুষ সব ধরনের মানুষ নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে?

অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল কবীর চৌধুরী: মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রধান অঙ্গ হলো ত্বক। তাপপ্রবাহ এ ত্বকেই লাগে। ত্বকে তাপপ্রবাহ লাগলে ত্বক গরম হয়ে যায়। ভেতরে থার্মো রেগুলেশন কন্ট্রোল নষ্ট হয়ে যায়। তিনি যদি ইলেকট্রোলাইটস ঠিকমতো খান, সোডিয়াম, পটাশিয়াম যেটা ওরস্যালাইন বলা হয়, তা যদি ঠিকমতো খাওয়া হয় তাহলে তার ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্সটা ঠিকমতো হবে। তাপ কমানোর জন্য ঠান্ডা পানি বা ভেজা কাপড় দিয়ে ত্বক মুছে ফেলা। শরীরের উত্তাপ বেরিয়ে গেলে ছায়ায় বা ঠান্ডা জায়গায় থাকার চেষ্টা করা। রোদ আর গরমে ঘামের কারণে ত্বকে ছত্রাক বেড়ে যাবে, খোসপাঁচড়া বেড়ে যাবে। গরমের সময় এ ধরনের সমস্যা যাদের রয়েছে তারা রোদ থেকে দূরে থাকবেন। শীতকালে ত্বকের সমস্যা হয়। এ সমস্যাগুলো রোধ করার জন্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত সুরক্ষা করতে হবে। কারণ ত্বক সুস্থ থাকলে শরীর সুস্থ। শরীর সুস্থ থাকলে মন সুস্থ, মন সুস্থ থাকলে মানুষ সুস্থ থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ