যানজটে থমকে নগরীর বিস্তৃত এলাকার যান চলাচল। চলছে ট্রাফিক সপ্তাহ। এর মাঝে ভয়াবহ যানজট। এই যানজট বন্দরকেন্দ্রিক। চরম দুর্ভোগে নাগরিক জীবন। গতকাল ভোর থেকে সৃষ্ট যানজটে অনেক মানুষ ফ্লাইট মিস করেছে। বিমানবন্দর থেকে শহরে পৌঁছতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরীর যানজটের জন্য চারটি কারণ চিহ্নিত করে সতেরোটি সুপারিশ করা হয়েছিল। এগুলো উপেক্ষিত থাকায় যানজটের এই অবস্থা। এই অবস্থার মাঝে নগরীর সদরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নৌ টেক্সি এবং বটতলী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস চালুর দাবি জানানো হয়েছে। নগরীতে গত বেশ কিছুদিন ধরে যানজট বেড়েছে। বিশেষ করে বন্দরকেন্দ্রিক যানজটে নাকাল নগরবাসী। গতকাল ভোর থেকে নগরীর বারিক বিল্ডিং থেকে ইপিজেড পর্যন্ত পুরো রাস্তা স্থবির হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটুও নড়াচড়া করেনি কোনো গাড়ি। বন্দরে প্রবেশ করতে আসা ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং প্রাইমমুভারগুলো রাস্তা দখল করে থাকায় পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে। বন্দরে গাড়ি প্রবেশের গেট সচরাচর খোলা হয় সকাল আটটায়। কিন্তু গতকাল দুপুর বারোটা পর্যন্ত গেট বন্ধ থাকে। এতে করে একটি গাড়িও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। সব গাড়ি রাস্তায় থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে পুলিশ বেসরকারি আইসিডিগুলো থেকে গাড়ি ছাড়া বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ করে।
অপরদিকে ফৌজদারহাটে পুলিশ নগরমুখী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান আটকে দেয়। বেলা বারোটার পর বন্দরে গেট খুললে একটি–দুটি করে গাড়ি ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। বিকাল নাগাদ গাড়ির জটলা কিছুটা কমলে ধীরলয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্দরকেন্দ্রিক যানজট নিয়ে বিশেষ পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কেন গেট খোলেনি? এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, একদিন আগের পরিবহন ধর্মঘটের কারণে বন্দর থেকে কোনো গাড়ি ছেড়ে যেতে পারেনি। আগের দিন ঢোকা গাড়িগুলো বন্দরের ভেতরে অবস্থান করছিল। সোমবার নতুন করে আরো গাড়ি ঢোকে। এতে করে বন্দরের ভেতরে গাড়ি ঢোকানোর মতো অবস্থা ছিল না। এই অবস্থায় বন্দরের অভ্যন্তর থেকে পণ্য নিয়ে বাইরে গাড়ি না যাওয়া পর্যন্ত ভেতরে কোনো গাড়ি প্রবেশ করানো যায়নি। দুপুর বারোটা নাগাদ ভেতরে কিছুটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে গাড়ি প্রবেশ করানো হয়।
পুলিশের পদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, বন্দরে ঢোকার জন্য গাড়ি এসে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। অপরদিকে বেসরকারি আইসিডিগুলো থেকেও গাড়ি আসতে থাকে। এতে করে রাস্তার অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে বেসরকারি আইসিডি থেকে গাড়ি বের করতে মানা করা হয়। পরবর্তীতে বন্দরের গেট খুললে বেসরকারি আইসিডির গাড়িগুলোও আস্তে আস্তে বের করে আনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের গেটে সৃষ্ট যানজটের কারণে ক্রমে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। বন্দর এলাকার যানজটের জের ধরে পরবর্তীতে নগরীর অন্যান্য এলাকায়ও বিস্তৃতি ঘটে। ক্রমে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি।
নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে ইপিজেড পর্যন্ত যানজট প্রসঙ্গে গতকাল ওই এলাকায় কথা হয় নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ এবং বন্দর সংশ্লিষ্টদের সাথে। তাদের মতে, এই এলাকার যানজটের জন্য দায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের গাড়ি। বন্দরের গাড়িগুলোর ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে না হওয়ার ধকল রাস্তায় চলে আসে। তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গেটগুলো বিমানবন্দর সড়কের উপর। বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে পোর্ট ব্রিজ পর্যন্ত বন্দরের চারটি গেট। এই চারটি গেট দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার গাড়ি বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করে। পণ্য নিয়ে বের হয়ে আসে। এসব ট্রাকের গেট পাস আগে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের ওখান থেকে দেওয়া হত। নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে সাইফ পাওয়ারটেক কাজ শুরু করার পর চারটি গেট দিয়ে প্রবেশ করা কয়েক হাজার ট্রাককে সংশ্লিষ্ট গেট থেকে পাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। একটি ট্রাক রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাস সংগ্রহ করে তবেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাস নিয়ে গিয়ে পেছনে জটের সৃষ্টি করছে। এই জটও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লেগে থাকে। বন্দরের চারটি গেটের পাস ইস্যুর কারণে সৃষ্ট জট পুরো এলাকার যান চলাচল ব্যবস্থায় বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। বড় বড় কন্টেনার মুভারগুলো বন্দরের চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনালের দুই নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে। এই গেটটি পুরোটাই রাস্তার উপর। এতে গেটে গাড়ি রেখে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে বন্দরে প্রবেশ করার সময় লম্বা কন্টেনার মোভারগুলো পেছনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি করে।
বন্দরকেন্দ্রিক এই যানজট নিরসনে ১৭ দফা সুপারিশ করা হলেও একটি বাস্তবায়িত হয়নি। ১৭ দফা সুপারিশে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের ৩ নম্বর গেট সকাল এগারটার পরিবর্তে সকাল সাতটা থেকে খোলা রাখা, বন্দর থেকে মালামাল বোঝাই ট্রাক বের হওয়ার জন্য নর্থ কন্টেনার ইয়ার্ডের পাশের রাস্তাটি উন্মুক্ত রাখা, ইছহাক ব্রাদার্স থেকে পুরাতন মার্কেট এবং বন্দর কলেজের রাস্তাটি ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যানের জন্য উন্মুক্ত রাখা, বন্দরের সামনে নির্মিত গোলচত্বরটিতে কন্টেনার মোভার ঘুরতে পারে না, এটি ছোট করে নির্মাণ করা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পোর্ট কানেক্টিং রোড পুরোপুরি চালুর ব্যবস্থা করা, বন্দরের প্রতিটি গেট অটোমেটেড করা, বন্দর ব্যবহারকারী গাড়িগুলোর জন্য পৃথক টার্মিনাল নির্মাণ করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন আসছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল বলেছেন, বন্দরের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোর জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা দরকার, নীতিমালা দরকার। যেমন এলসিএল কন্টেনার দুনিয়ার কোনো জায়গায় বন্দরের ভেতরে হ্যান্ডলিং করা হয় না। অথচ এখানে হ্যান্ডলিং করা হয়। একটি কন্টেনারকে ঘিরে সাত–আটটা পর্যন্ত ট্রাক দাঁড়ায়। এতে বন্দরের অভ্যন্তরের অপারেশনাল এরিয়া কমে যায়। এই ধরনের আরো বেশ কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমরা সরকারকে জানিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়ন করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ বলে জানান তারা।
ভয়াবহ যানজটের মাঝে গতকাল অনেক মানুষ ফ্লাইট মিস করেছেন। সকাল থেকে দুপুর অব্দি অনেকে নানা পথে ভোগান্তি সয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছেন। বিকালের দিকে দুটি হজ ফ্লাইটের প্রায় সাড়ে সাতশ হজযাত্রী এবং তাদের আত্মীয়–স্বজনদের নানা বিকল্প পথ মাড়িয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছতে হয়েছে।
বিমানবন্দর সড়কের এই পরিস্থিতিতে নগরীর সদরঘাট থেকে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাট পর্যন্ত নৌ টেঙি এবং বটতলী রেলওয়ে স্টেশন থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ডেমু ট্রেন সার্ভিস চালু করার দাবি জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ঢাকার হাতিরঝিলে নৌ টেঙি চালু হয়েছে। এখানে বিনোদনের জন্য নয়, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় এই সার্ভিস চালু করার সময় এসেছে। যেভাবে ফ্লাইট মিস করার ঘটনা ঘটছে, তাতে শুধু মানুষের ভোগান্তিই নয়, ব্যবসা–বাণিজ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া বিদেশ থেকে আসা বিনিয়োগকারীসহ ব্যবসায়ীদের শহরে পৌঁছতে যদি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে তাতে যে ইমেজ সংকট তৈরি হবে, তা পোষাতে চড়া মূল্য দিতে হবে।




