ষ্টাফরিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য পেঁয়াজের বাজারে যেন সরকার, আমদানিকারক, আড়তদার, পাইকার-কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিদিনই দফায় দফায় বাড়ছে দাম। দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে গতকাল দেশী পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৬২ টাকা এবং ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০-৭২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে খুচরা দোকানিরা বিক্রি করেছেন সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত। মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে ভোক্তারা ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিক্রিও কমেছে কিছুটা।
দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতে বন্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ায় ঈদের আগে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের খোলা আমদানি ঋণপত্র (এলসি) বাতিল করে দেয়া, ঈদের ছুটি উপলক্ষে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্রম ৪-৫ দিন বন্ধ থাকা, বেশি দামে পেঁয়াজ আমদানি করে লোকসান দেওয়ার আশঙ্কা ইত্যাদি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যত দ্রুত সম্ভব ভারত ছাড়া চীন, পাকিস্তান, ইরানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে পেঁয়াজ আমদানি করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তারা। অন্যথায় আসন্ন কোরবানি মৌসুমে পরিস্থিতি যেমন আরও জটিল হবে তেমনি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে পেঁয়াজের দাম।
অবশ্য কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন ভিন্ন কথা। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সুপ্রভাতকে বলেছেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা অজুহাত পেলেই পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেন। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও হয়েছে তা-ই। না হলে ঈদের ৩ দিন ছুটির পর প্রথম খোলার দিনই কীভাবে ৪৫-৫০ টাকার পেঁয়াজ খুচরা বাজারে এক লাফে ৭০ টাকা হয়ে যায়? তখন তো বলতে গেলে পাইকারি বাজার খুলেই নি। এ থেকেই বোঝা যায়, একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয়, যারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।’ মজুদদারির বিরুদ্ধে নজরদারির অভাবেই পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীলতা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ভারতে পেঁয়াজ নিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়েছে অতিসম্প্রতি। ঈদের ছুটির পর স্থলবন্দর বন্ধ ছিল ৪-৫ দিন। এরপর ছিল হরতাল। স্বাভাবিকভাবে আমদানি করা পেঁয়াজের গাড়ি ঢুকেছে হাতেগোনা। কিন্তু আমরা দেখলাম বাজার থেকে প্রথমে পেঁয়াজ উধাও হয়ে গেল, দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এখন সয়লাব হয়েছে। আমাদের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে মাত্র লাখ-সোয়া লাখ টন ঘাটতি থাকে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। তাহলে পুরোদমে আমদানি চলাকালীন ও দেশি পেঁয়াজের মজুদ শেষ হওয়ার আগেই কেন সংকট হবে? এটা অবিশ্বাস্য। আমাদের কাছে খবর আছে দেশের ব্যবসায়ীদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এরপরও যদি একান্তই সংকটের আশঙ্কা থাকে তবে এখনই সময় মায়ানমার, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবিকে এক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে।’
চট্টগ্রামে পেঁয়াজ আমদানিকারক নেই!
সুপ্রভাত বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে রসুন ও আদা অনেকে আমদানি করলেও পেঁয়াজ আমদানিকারক নেই। স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হয় বলে পেঁয়াজের বাজারটি সীমান্তবর্তী ও ঢাকার শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরাই নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এবার সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির চিন্তা-ভাবনা করছেন চট্টগ্রামের আমদানিকারকেরা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেছেন, ‘পেঁয়াজের যে সংকট তা খুব সম্ভবত সাময়িক। চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে বাজার। এর ওপর রয়েছে দূরত্বজনিত গাড়িভাড়ার তারতম্য, যানজট ইত্যাদি বিষয়ও। এখনও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামীকাল খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত আপনাদের জানাতে পারবো।’
খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের আড়ত মেসার্স বদর আউলিয়া ভাণ্ডারের ব্যবস্থাপক মো. নুরুচ্ছফা গতকাল সুপ্রভাতকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের কোনো আমদানিকারক পেঁয়াজ আমদানি করেন না। সীমান্তের পার্টিরাই চট্টগ্রামে পেঁয়াজের ট্রাক পাঠান। আমরা বিক্রি শেষে কেজিপ্রতি মাত্র ৩০ পয়সা পেয়ে থাকি। এখানে দাম বাড়লেও আমাদের কোনো লাভ নেই, কমলেও ক্ষতি নেই।’ গতকাল ভারতের পেঁয়াজ কেজি ৭০ টাকা বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
মেসার্স মেহের ট্রেডার্সের মালিক মো. আলী বলেন, ‘আগে যেখানে প্রতিদিন ৫০০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করেছি এখন সেখানে ১০০ বস্তায় নেমে এসেছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশি পুঁজি খাটিয়েও আমাদের লাভ কিন্তু কেজিপ্রতি ৩০ পয়সাই।’
তিনি জানান, ‘সীমান্তের ভোমরা, সাতক্ষীরা, সোনা মসজিদ, বেনাপোলের ব্যবসায়ীরাই পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। কয়েক বছর আগেও একবার এমন সংকট দেখা দিয়েছিল পেঁয়াজের। বর্তমানের অস্বাভাবিক বাজার নিয়ে ভোক্তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। ভারত ও বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে আগামীকাল (আজ) পৃথক দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতেও পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হবে রোববার। আশা করি সোম-মঙ্গলবার পেঁয়াজের বাজার কোন দিকে যাবে তা চূড়ান্ত হবে।’
৬৫০ ডলারের নিচে রপ্তানি নয়
পেঁয়াজ উৎপাদন ও রপ্তানিতে নাম্বার ওয়ান দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতেই এখন অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যটি নিয়ে টালমাটাল অবস্থা চলছে। কোথাও বিক্রি হচ্ছে ৬০ রুপি, আবার কোথাও ৮০ রুপি। মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিজেপি কর্মীদের বিক্ষোভও চলছে রাজপথে।
ইন্টারনেট সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে দেশটি টনপ্রতি রপ্তানিমূল্য ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ ডলার বেঁধে দিয়েছে। এর চেয়ে কমে রপ্তানি করতে পারবেন না ব্যবসায়ীরা। উল্টো দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম সহনীয় রাখতে ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়াকে (নাফেদ) পাকিস্তান ও ইরান থেকে আমদানি করতে বলেছে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রকসহ বুধবার আন্তঃমন্ত্রকের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত বৃহস্পতিবার থেকে কলকাতার নয়টি এলাকায় প্রতিকেজি ৩৫ রুপি দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। প্রতিজনকে দেওয়া হচ্ছে ৫০০ গ্রাম। এর আগে বুধবার ভারতের সংসদ লোকসভায় পেঁয়াজের দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন পি করুণাকরণ। জবাবে কেন্দ্রীয় ক্রেতা সুরক্ষা, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রী কে ভি টমাস বলেন, রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে ভারত ৫ লাখ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছে বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। আগের অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টন। এর মধ্যে রপ্তানি করেছিল ২০ লাখ টন। বিভিন্ন রাজ্যে বছরের বিভিন্ন সময় পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও ৮০ ভাগই হয় মহারাষ্ট্র ও কর্নাটক রাজ্যে।
ভারতের পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ ছাড়াও আঁচ বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্যেও। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বাজারে এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। আমিরাতের বাজারে ভারতীয় যে পেঁয়াজ ছিল ২ দশমিক ৭০ দিরহাম, গত বৃহস্পতিবার বিক্রি হয়েছে ৩ দশমিক ২০ দিরহামে।




