সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনতিন বছর পর চট্টগ্রাম হবে বিশ্বমানের নগরী

তিন বছর পর চট্টগ্রাম হবে বিশ্বমানের নগরী

নগরীকে বিলবোর্ডমুক্ত করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ধারণাতীত সাফল্য পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর উপলক্ষে রোববার বিকেলে মেয়রের দপ্তরে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চসিক নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত এম মনজুর আলমকে পৌনে দুই লাখ ভোটে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আ জ ম নাছির উদ্দীন। ৬ মে শপথ নিলেও আইনি জটিলতায় দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন ২৬ জুলাই।

নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা আ জ ম নাছির উদ্দীনকে এক বছরের কাজের মূল্যায়ন করতে বলা হলে আত্মপ্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু বললে নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মতো হবে। সফলতা-ব্যর্থতা নগরবাসী বিচার করবেন। অনুরোধ থাকবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে যেন বিচার করা হয়। বিলবোর্ডমুক্ত নগরী গড়া, দৃষ্টিকটু প্রক্রিয়ায় দিনের পরিবর্তে রাতে আবর্জনা-বর্জ্য অপসারণ, নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার করে দ্রুততম সময়ে বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধারণাতীত সফলতা পেয়েছি।’

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ বছর পরই প্রকৃত মূল্যায়নের সময় উল্লেখ করে মেয়র বলেন, সত্যিকারের মূল্যায়নের জন্যে মাত্র এক বছর যথেষ্ট সময় নয়। যে পরিস্থিতিতে, যে পরিবেশে আমি দায়িত্ব নিয়েছি, যে অবস্থায় চসিককে আমি পেয়েছি সে সব বিবেচনায় রেখেই মূল্যায়ন করা উচিত।

এক প্রশ্নের উত্তরে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, আমার নির্বাচনী ইশতেহারে আমি যেসব স্বপ্ন দেখিয়েছি প্রতিটি বাস্তবায়ন করবো। ব্যর্থতা আমার অভিধানে নেই। আগামী তিন বছর পর চট্টগ্রাম হবে একটি বিশ্বমানের নগরী। সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করছি। আমি নগরবাসীকে বিশ্বমানের নগর উপহার দেবো। কিন্তু বিশ্বমানের নগরের পূর্বশর্ত বিশ্বমানের নাগরিক। সেটি তাদের নিশ্চিত করতে হবে। বহুল প্রশংসিত রাতের বেলা বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শতভাগ সফল হয়নি কেন? কিছু কিছু এলাকার মানুষ চসিকের আহ্বানে সাড়া দেননি।

আমরা ২০ লাখ লিফলেট বিলি করলাম। মাইকিং করলাম। স্থানীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিলাম। আমাদের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীরা রাত জেগে বর্জ্য পরিষ্কার করলো, কিন্তু কিছু মানুষ দিনের বেলা আবার বর্জ্য ফেলে শহরটা নোংরা করলো। এবার আমরা আর ডাস্টবিন দেখতে চাই না। ঘরে ঘরে বিন দেবো, রিকশাভ্যানে সব বর্জ্য সংগ্রহ করে অপসারণ করবো। এটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। শুধু সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করলে তো হবে না। নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। যোগ করলেন মেয়র।

আগের মেয়রের (মনজুর আলম) সময়কালের তুলনামূলক চিত্র দিয়ে মেয়র বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের সময় চসিকের মাসে বেতন আসতো ৯ কোটি টাকা। এখন ১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে দুশতাধিক শিক্ষক, ডাক্তার-নার্স-টেকনোলজিস্ট, প্রকৌশলীসহ জনবল বাড়ানো হয়েছে। বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে মাসে ১৮-১৯ কোটি টাকা বেতন বাবদ খরচ হবে।

তিনি বলেন, মহিউদ্দিন ভাইয়ের পিরিয়ডের ঠিকাদারের বিল এখনো বকেয়া। আগের মেয়রের আমলের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া। আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাড়ে তিনশ কোটি টাকা দেনা ছিল চসিকের। ইতিমধ্যে ১৫৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি সামল দিতে। কয়েক বছরের মধ্যে দায়-দেনা শোধ করে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।

সরকারি বরাদ্দ কম পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্য যেকোনো অর্থবছরের চেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছি। কিন্তু আমরা যত বরাদ্দ চেয়েছি তার তুলনায় কম পেয়েছি। এর পেছনে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিশেষ করে আইনি প্রক্রিয়া, বিধিবিধান আর বরাদ্দ ছাড় করাতে দীর্ঘসূত্রতা। আমাদের দ্রুত রেজাল্ট পেতে হলে প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। আশাকরি, এক বছরের অভিজ্ঞতায় চলতি অর্থবছরে আমরা আশানুরূপ বরাদ্দ পাবো।

নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ চলছে জানিয়ে মেয়র বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফেরাতে আমি কঠোর অবস্থান নিয়েছি। প্রকৌশলীরা ফিল্ডে না গিয়ে ডিপিপি তৈরি, নকশা করা, স্টিমেট করা, কাজ না করে কিংবা নামমাত্র কাজ করে ঠিকাদারের টাকা তুলে নেওয়া সব বন্ধ করে দিয়েছি। ৬৫ লাখ মানুষের সেবার জন্যে চসিকের প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর লক্ষ্যে অর্গানোগ্রাম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। অন্যান্য সেবাদাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করেছি। যদিও কর বাড়ানো হয়েছে বলে অন্যায্য সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। যারা এমনটি করেছে, তাদের জানা উচিত ছিল মেয়রের বা চসিকের কর বাড়ানোর ক্ষমতা নেই। এটি আইন, বিধিবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, একটি বিষয় সবাই স্বীকার করবেন চট্টগ্রাম শহরে আগের মতো জলাবদ্ধতা নেই। এখন ভারী বৃষ্টি হলে পানি জমছে কিন্তু দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেমেও যাচ্ছে। কারণ জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে আমরা খাল-নালা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নিয়েছি। খাল-নালা থেকে প্রচুর বর্জ্য আর মাটি তুলেছি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে বহদ্দারহাট-বারইপাড়ার খাল খননের পাশাপাশি আরও দুটি নতুন খাল খননের ডিপিপি তৈরি করছি। একই সঙ্গে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মদুনাঘাট থেকে পতেঙ্গা নেভাল পর্যন্ত নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধ, ২৬টি খালের মুখে পাম্প হাউসসহ স্লুইসগেট স্থাপনের মতো একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ওই বেড়িবাঁধে দুই লেনের সড়ক তৈরি করা হবে চসিকের উদ্যোগে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে একটু সময় লাগবে। তবে একবার বাস্তবায়ন হয়ে গেলে আর জোয়ারের পানিতে নগরীর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাবে না।

নিজে বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা নেন না জানিয়ে আ জ ম নাছির বলেন, ‘চসিকের তহবিল থেকে আমি বেতন-ভাতা, গাড়ি, ফুয়েল (জ্বালানি) ইত্যাদি নিচ্ছি না। সবই চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে। আল্লাহ আমাকে নিজের আয়ে চলার তৌফিক দিয়েছেন। আমি মেয়র হয়েছি চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টে দেওয়ার জন্যে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ