কমিটি নিয়ে গোলক ধাঁধায় বিএনপির নেতারা। কাউন্সিলের প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। কেন হচ্ছে না, সে বিষয়েও দলের নীতিনির্ধারকরা অন্ধকারে। দলের চেয়ারপারসন কঠোর গোপনীয়তায় কমিটি গঠন নিয়ে কাজ করছেন। নেতাদের অতিমাত্রায় দোষারোপ ও কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধে সবাইকে খুশি করেই কমিটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। নিষ্ক্রিয়তার কারণে নেতাদের বাদ পড়ার সম্ভাবনা কম। কিছু নেতাদের পদোন্নতি দিয়ে নতুন কিছু মুখ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ছেলে তারেক রহমানের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন তিনি। সংকেত পাওয়ার পরই আসতে পারে নতুন কমিটির ঘোষণা।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাকি কমিটি গঠনে দলের চেয়ারপারসন কাজ করছেন। দ্রুতই কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে আশা করি। যারা যোগ্য ও ত্যাগী, নতুন কমিটিতে তাদেরই জায়গা হবে। সূত্র জানায়, দলের মধ্যে সৃষ্ট কোন্দল ও নেতাদের ক্ষোভ নিরসনের কৌশল নিয়েছেন খালেদা জিয়া। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর নেতাদের মধ্যে যাতে ক্ষোভের সৃষ্টি না হয়, সেই বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সব গ্রুপকে প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রুপের নেতাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকি ক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে কমিটি নিয়ে সরাসরি কথা বলছেন চেয়ারপারসন। পাশাপাশি যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকেও নামের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক প্রায় অর্ধশত নেতাকে এবার নির্বাহী কমিটিতে জায়গা দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
দলের একাধিক নীতিনির্ধারক ও চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ কয়েক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্বে আটকে আছে জাতীয় স্থায়ী কমিটি। নির্বাহী কমিটির বাকি অংশের খসড়া তালিকা হলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ দলের সব উইংয়ের নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরি করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেয়া হয়েছে। ঈদের আগে জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যানদের নাম ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিটির বাকি নেতাদের নাম ঈদের পর ঘোষণা করা হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের ওপর।
সূত্র জানায়, ঘোষিত কমিটি নিয়ে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হন লন্ডনে অবস্থানরত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। খালেদা জিয়া বিষয়টি জানার পর কমিটির বাকি নেতাদের নাম ঘোষণার আগে ছেলের পরামর্শের জন্য এক প্রতিনিধিকে লন্ডনে পাঠান। নির্বাহী কমিটির একটি খসড়া তালিকাও তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়। ওই খসড়া তালিকার পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যম থেকেও তারেক রহমান নেতাদের সম্ভাব্য একটি তালিকা করেন। দুই তালিকা সমন্বয় করে একটি চূড়ান্ত নাম খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানো হবে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারেক রহমান এখনও ওই চূড়ান্ত তালিকা পাঠাননি। এ কারণেও কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব হচ্ছে বলে দলের একটি অংশের ধারণা।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, কাউন্সিলে কমিটি করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা চেয়ারপারসনকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে হয়, আমরা সবাই তাকে যথাযথ সহযোগিতা করছি না। উল্টো কমিটি নিয়ে নানা সময়ে নানা মন্তব্য করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, নিজেদের লোকদের কমিটিতে জায়গা করে দিতে আমরা নানাভাবে সুপারিশ করছি। আবার কারও বিরুদ্ধে বলছি। আমরা যদি সত্যি তাকে ক্ষমতা দিয়ে থাকি, তাহলে তো এসব করার কথা না। আমার ধারণা, চেয়ারপারসন সবদিক বিবেচনা করে ভালো একটি কমিটি করার লক্ষ্যে কিছুটা সময় নিচ্ছেন। তবে আশা করি, খুব দ্রুতই তিনি কমিটি ঘোষণা করবেন।
১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর তিন ধাপে মহাসচিবসহ ঘোষণা করা হয় ৪১ নেতার নাম। নতুন কমিটি ঘোষণার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা থাকার কথা, তা দেখা যাচ্ছে না। উল্টো কমিটি ঘোষণার পর থেকে দলের মধ্যে কোন্দল আরও মাধাচাড়া দিয়ে ওঠে। কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ না নেয়ায় আগে থেকেই তারা ছিলেন ক্ষুব্ধ। ঘোষিত কমিটিতে নিজের অনুসারীরা পদ না পাওয়ায় তারা আরও ক্ষুব্ধ হন। এতে অতিমূল্যায়ন, জ্যেষ্ঠতা লংঘন এবং জাতীয়ভাবে পরিচিত নয়- এমন কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কমিটি নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও করেন অনেকে। জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, দলের চেয়ারপারসন কমিটি গঠন নিয়ে কাজ করছেন। যথাশিগগিরই তিনি কমিটি ঘোষণা করবেন।
দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্বে আটকে আছে স্থায়ী কমিটি : দলের গঠনতন্ত্রে স্থায়ী কমিটির সংখ্যা ১৯। বর্তমানে যারা স্থায়ী কমিটিতে আছেন তাদের ছাড়াও নতুন বেশ ক’জন সিনিয়র ও জুনিয়র নেতা ওই পদ পেতে জোর তদবির চালাচ্ছেন। এ নিয়ে বিপাকে আছেন খালেদা জিয়া। দলের একটি অংশ এ সংকট মোকাবেলায় স্থায়ী কমিটির আকার বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তা নাকচ করে দেন। তার এমন মনোভাবের পর পদপ্রত্যাশী কয়েকজন বাদ পড়ছেন, এটা মোটামুটি নিশ্চিত।
স্থায়ী কমিটির সদস্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, ড. আর এ গনি ও সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী জীবিত নেই। বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম ও বেগম সরোয়ারী রহমান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। প্রথমে তাদের বাদ দেয়ার চিন্তা থাকলেও নেতাদের অতিমাত্রায় তদবিরে আপাতত তাদের বাদ নাও দেয়া হতে পারে। এ দু’জনকে বাদ দেয়া না হলে সেক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ আসবে তিনজন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থায়ী কমিটিতে যাচ্ছেন- এটা নিশ্চিত। বাকি দুই পদের জন্য চলছে দুই প্রজন্মের লড়াই। মূলত এ দ্বন্দ্বের কারণেই আটকে আছে স্থায়ী কমিটি। সিনিয়র হিসেবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, এম মোর্শেদ খান, সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল আউয়াল মিন্টু, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, হারুন আল রশিদ, শাহ মোয়াজ্জেমের নাম আলোচনায় রয়েছে। আর জুনিয়র হিসেবে আলোচনায় আছেন সাবেক যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শাহজাহান। উপরের সিনিয়রদের মধ্যে দু’জনের পদ নিশ্চিত। অপরদিকে জুনিয়র থেকেও একজন মোটামুটি নিশ্চিত। বাকি দুটি পদে সিনিয়র না জুনিয়র, তা নিয়ে চলছে দেনদরবার। এ নিয়ে সিনিয়র নেতারাও গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে শেষ মুহূর্তে কোন প্রজন্মের জয় হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় নেতাকর্মীরা।




