একটু কঠিন করে বললে বলতে হবে, মরা লাশে আমরা প্রাণের সঞ্চার করেছি। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আধুনিক করে তোলা এবং একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ঠিক এমন মন্তব্যই করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিমান আজ জাতীয় গর্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে, সারা বিশ্বে বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান যাচ্ছে, আরও নতুন নতুন গন্তব্যে যাবে। আর এভাবেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের মানুষ নিজস্ব ক্যারিয়ারে দেশে আসতে চায়, তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্ব, বলেন প্রধানমন্ত্রী। ১২ জানুয়ারি দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে ‘মেঘদূত’ ও ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামে দু’টি বোয়িং উড়োজাহাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাত্রীসেবা বাড়িয়ে বিমানকে শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, বিদেশিদের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলার তাগিদ দেন তিনি। ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ এমন একটি স্থানে যা পূর্ব-পশ্চিমে সেতু গড়তে পারে। পাশ্চাত্য-প্রাচ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার সব সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে আমরা সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছি, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯৬ সালের আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বেহাল দশার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে কথা ও চিত্র সবারই মনে আছে। এখন বিমানবন্দর, রানওয়ের মান উন্নত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে ব্যবর্হত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতেও বিমান তার ফ্লাইট পরিচালনা করে সচল করে তুলেছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে একটি আঞ্চলিক বন্দরে পরিণত করার সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করি এই বিমান বন্দরটিকে আমরা আরও উন্নত করে গড়ে তুলতে পারবো। তাতে ভারতসহ প্রতিবেশি দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা সহজ হবে। আর তার মধ্য দিয়েই এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়বে। নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মেঘদূত ও ময়ূরপঙ্খীর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক রুটগুলোতেও এই ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এখন নিজস্ব যাত্রীবাহী ফ্লাইট অপারেসন্সের পাশাপাশি কার্গোবিমান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানিকারকরা বিদেশ থেকে কার্গো ভাড়া করে তাতে রপ্তানিপণ্য পাঠাচ্ছেন, এতে খরচ বেশি পড়ছে। বিমান কার্গো চালু করলে তাদের অনেক সুবিধা হবে আর বিমানও লাভবান হবে। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, স্ক্যানিংয়ের সঠিক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিমানকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বিমান শুধু আপনাদের জীবন-জীবিকার পথই নয় একটি জাতীয় প্রতীক, যা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। বিমান আপনাদেরই প্রতিষ্ঠান। সুনাম কুড়ালে তা আপনাদের গর্বের হবে, না হলে তা হবে লজ্জার। আমরা কষ্ট করে সব ঠিক করে দিচ্ছি, এগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের,’ বিমান কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিমানের যে উন্নয়ন হয়েছে তার ধারাবাহিকতা যেনো টিকে থাকে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে নেমে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, এটা যাতে না হয় সেদিকটা লক্ষ্য রাখতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিমানের সিইও উইং কমান্ডার আসাদুজ্জামান, বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামালউদ্দিন আহমেদ, বেসরকারি বিমান চলাচল বিভাগের সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ডেভিড মিলি ও বোয়িংয়ের প্রতিনিধি সবিতা গৌড়।
বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিমান আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে সত্যিকার অর্থেই আজ জাতীয়পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যটন বছর হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বছর বিমানের মাধ্যমে দেশে অারও আরও পর্যটক আসবে সেটাই সরকারের প্রত্যাশা, বলেন রাশেদ খান মেনন। বিমান যে পথে লাভজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো তার চিত্র তুলে ধরে চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, গত অর্থবছরে বিমান ২৭২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। বিমান কর্মীরা তাদের দক্ষতা দেখিয়ে এই অর্জন নিশ্চিত করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিমানকে একটি ‘ভালো পে মাস্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাওনা পরিশোধ করে ধীরে ধীরে বিমান একটি শক্ত অবস্থানে এগিয়ে যাচ্ছে। খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, গুনগত মান বিচারে বিমান এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় পার করছে। বিমানের সিইও উইং কমান্ডার আসাদুজ্জামান যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করেন এবং বিমান এগিয়ে যাবে এমন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ডেভিড মিলি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ক্রমশই আধুনিকতর ফ্লাইট ক্যারিয়ারে পরিণত হচ্ছে, আর তা একটি আধুনিক বাংলাদেশেরই পরিচয়। বোয়িংয়ের প্রতিনিধি সবিতা গৌড় তার বক্তৃতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িং এর মধ্যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, আশাকরি এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।




