বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনআওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনে হাল ধরেছিলেন বাবু ভাই

আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনে হাল ধরেছিলেন বাবু ভাই

বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেছেন, ‘১৯৬০ সালে বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে এসেছিলেন বাবু ভাই। ৬ দফা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান ছিল তার। আন্তর্জাতিক বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনে চট্টগ্রামের হাল ধরেছিলেন বাবু ভাই। স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন তখন তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। গতকাল বিকালে নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নাগরিক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। আখতারুজ্জামান চৌধুরী নাগরিক স্মরণসভা কমিটি আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘চমৎকার মানুষ ছিলেন বাবু ভাই। আমার জীবনে অনেক রাজনীতিবিদের সংস্পর্শে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর বিশালতা ছিল সমুদ্রের মতো। সেই বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মানুষ ছিলেন বাবু ভাই। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। চালচলন মার্জিত। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেত বাবু ভাই। তার মতো বিনয়ী মানুষ কম আছে।

আখতারুজ্জামান বাবুর অবদানের কথা স্মরণ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘১৯৮৮ সালে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে লালদীঘি মাঠের জনসভায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল তখন শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান বাবুর বাসায়। দুইদিন বাবু ভাইয়ের বাসায় থাকার পর নিরাপদে ঢাকা পৌঁছতে শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করেছিলেন এই বাবু ভাই। এর আগে বাবু ভাইয়ের বাসায় থাকার সময় নিজ হাতে রান্না করে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন তিনি। সবকিছু অকাতরে বিলিয়ে দিতেন বাবু ভাই। দলের প্রতি, সমাজের প্রতি যে অবদান বাবু ভাই রেখে গিয়েছেন শুধু একটি বিষয় অপূর্ণ থেকে গেছে তার জীবনে। সেটি হলো ক্যাবিনেট মিনিস্টার হওয়া। কিন’ সেটি তার চাওয়া ছিল না। কারণ তিনি মাটির মানুষ ছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, বাবু শুধু আওয়ামী লীগের প্রিয় মানুষ ছিলেন না; দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিও ছিলেন তিনি। বাবু ভাই রাজনীতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িকভাবেও সফল নেতা ছিলেন। এ কারণে তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি হয়েছিলেন। দেশ-বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে দিয়েছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগকে একটি পরিবার আখ্যা দিয়ে তোফায়েল বলেন, ‘৬ দফা অন্দোলন শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে। পাকিস্তানে কারাভোগের পর দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু প্রথম জনসভাও করেছিলেন চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে। আর ওই জনসভার সংগঠক ছিলেন বাবু ভাই। আজ আমরা এখন চট্টগ্রাম এলে থাকি সার্কিট হাউস কিংবা কোনো হোটেলে। বাবু ভাইয়ের আমলে চট্টগ্রাম এলে থাকতাম তার বাসায়।’
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে তোফায়েল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছিলেন। কিন’ অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। কিন’ অসমাপ্ত কাজ সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন অর্থনৈতিক মুক্তি। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে।’ শেখ হাসিনার প্রশংসা করে আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা যদি প্রধানমন্ত্রী না হতেন তাহলে ইতিহাসের দায় মোচন হতো না। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের এবং এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হতো না।’ ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াতের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করে তোফায়েল বলেন, ‘আপনাদের কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবেন না। আপনি (বেগম খালেদা জিয়া) বলেছিলেন শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবেন না। অথচ আদালতে হাজিরা দিয়ে আপনি নিজেই আপনার বাসায় ফিরে গেলেন।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় জাসদের কার্যকরী সভাপতি এবং সংসদ সদস্য মাঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন, কালুরঘাট সেতু কাম রেললাইন, কর্ণফুলীর মোহনা থেকে মিরসরাই পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ কাম সড়ক নির্মাণের স্বপ্ন ছিল বাবু ভাইয়ের। ২০০৮ সালে আমি যখন এমপি হই তখন সংসদে এসব বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনা করা তাগিদ দিয়েছিলেন তিনিই। তাই তোফায়েল ভাইয়ের (বাণিজ্য মন্ত্রী) দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন। এ টানেল যদি তার নামকরণে করা হয় তাহলে এটি হবে তার প্রতি বড় শ্রদ্ধা। চট্টগ্রামের উন্নয়নে বাবু ভাইয়ের দেখা বাকি স্বপ্ন সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, কালুরঘাট সেতু কাম রেললাইন এবং উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করা হয় তাহলে এসব কাজই হবে তার প্রতি যথার্থ মর্যাদা। কারণ বাবু ভাই দেশ ও জাতিকে সর্বস্ব দিয়েছেন। বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বাবুর পুত্র ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ‘সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, আমার বাবা মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন। মানুষের জন্য তিনি সবকিছু উৎসর্গ করেছেন। তিনি পরিবারের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সময় দিয়েছেন। মানুষের ভালবাসার কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্যে আমার বাবা বেঁচে থাকবেন। আমি যেন বাবার মতো আপনাদের পাশে থাকতে পারি সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘বাবু ভাই বলতেন একজন রাজনীতিবিদ নীতিভ্রষ্ট হলে তার রাজনীতি থাকে না। সেই বাবু ভাইয়ের কথা আজ প্রমাণ করে রাজনীতিতে আজ নীতি ও আস’ার সংকট চলছে। তবু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল চাপ উপেক্ষা করে ইতিহাসকে দায়মুক্তি দিচ্ছেন। বাবু ভাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের পর চট্টগ্রামে প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বাবু ভাই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ে বাবু ভাই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। তার আবাসিক ভবন জুপিটার হাউজ ছিল মুক্তিযুদ্ধকালে নানা পরিকল্পনা, বৈঠকের কেন্দ্রস’ল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তার ছোটভাই বশরুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ হন। নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। তার রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র এবং চট্টগ্রামের উন্নয়ন।

নাগরিক স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন-সাবেক মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা নদভী, সংসদ সদস্য সাবিহা নাহার মুছা, কমরেড শাহ আলম, ইউটিসির উপাচার্য ড. প্রভাত চন্দ্র বড়-য়া, ক্রীড়া সংগঠক দিদারুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ার, চুয়েট উপাচার্য ড. মাহতাব জাহাঙ্গীর, বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, বিজিএমই’র সিনিয়র সহসভাপতি মাঈনুদ্দিন মিন্টু, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক, চট্টগ্রাম ক্লাবের সাবেক সভাপতি ডা. মঈনুল ইসলাম মাহমুদ, সংসদ সদস্য চেমন আরা তৈয়ব, জাসদ চট্টগ্রাম মহানগর নেতা মো. জসিম উদ্দিন, পেশাজীবী নেতা ডা, একিউএম সিরাজুল ইসলাম, নাগরিক স্মরণসভা কমিটির সদস্য সচিব আবু সুফিয়ান, অ্যাডভোকেট মো. নাজমুল আহসান খান, মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি এজাজ ইউসুফী এবং খাতুনগঞ্জ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগির আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন চৌধুরী এবং কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল।

  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ