প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শেখানোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছিল, দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। আমরা ক্ষমতায় গিয়ে সে ধারা বন্ধ করেছি। এখন শিশু-কিশোররা সঠিক ইতিহাস শিখছে। তাদেরকে বড় মানুষ হয়ে ওঠার জন্য সব উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। শিশু অধিকার রক্ষায় কাজ করছি। একদিন তোমরাই দেশের নেতৃত্ব দেবে উল্লেখ করে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যোগ্য মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার আহবান জানান তিনি। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী আলোচনা সভা শেষে কৃতী ছাত্র-ছাত্রী এবং দাবা, চিত্রাঙ্কন ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।
উপস্থিত শিশুদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা আরও বলেন, পাকিস্তানিদের নির্যাতন সহ্য করেছেন এদেশের মানুষ। ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তোমাদের মধ্যে থেকেই আগামীতে মন্ত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক কৃষিবিদ হবে। আজ শিশুদের মাঝে যে চেতনা এসেছে তা স্বাধীনতার চেতনা। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের শিশুরা স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানতো না। অথচ দেশের বাইরের মানুষ সঠিক ইতিহাস জানতো। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরেছে।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তাকে বাবার মরদেহের পাশ থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বিদেশে ছিলাম। একবার ভেবেছিলাম, রাসেলকেও নিয়ে যাই। কিন্তু আব্বা-আম্মা তাকে ছাড়তে চাননি। রাসেলকে নিয়ে গেলে আজকে সে বেঁচে থাকতো ও তার বয়স ৫০ বছর হতো বলেও আক্ষেপ করেন শেখ হাসিনা। দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের নামে মা তার ছোট ভাইয়ের নাম শেখ রাসেল রাখেন বলেও জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বারট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন। তার বইয়ের অনুবাদ বাবা মাকে পড়ে শোনাতেন। এ অনুপ্রেরণা থেকে মা তার ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে হত্যাকাণ্ডই ছিল না, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়া আর স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে দেশকে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাকে ক্ষমতার লোভে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু তার পরিবারের দোষ কি ছিল? ছোট্ট শিশু রাসেলের কি দোষ ছিল? আমরা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করে দেশকে এগিয়ে নিয়েছি। নারী-শিশু হত্যার বিচার করেছি। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আর কোনো দিন যেন ঘটতে না পারে সেক্ষেত্রে এ বিচার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, আমরা আর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড দেখতে চাই না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি রাজনৈতিক কারণে বার বার জেল খেটেছেন, আর আমরা ভাই-বোনেরা পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হয়েছি। বিশেষ করে ছোট্ট শেখ রাসেল বার বার আব্বাকে খুঁজতো। জেলখানায় মাসহ আমরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েও ছোট্ট শিশুটিকে কষ্ট পেতে দেখেছি। ১৯৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ছোট্ট রাসেল তখন কিছুই বুঝতো না। গ্রেফতার হওয়ার পর রাসেল শুধু বাবাকে খুঁজতো। আমরা যখন বাবাকে জেলখানায় দেখতে যেতাম, রাসেলও আমাদের সঙ্গে যেতো। সেখানে রাসেল বাবাকে না নিয়ে ফিরে আসতে চাইতো না। তখন আমার মা তাকে শান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, আমিই তোমার বাবা, আমিই তোমার মা। অবুঝ রাসেল একবার আব্বাকে আর একবার আম্মাকে বাবা বলে ডেকেছে।
শেখ রাসেলের স্মৃতি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে শিশুদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করেছে। কম্পিউটার শিক্ষাসহ আধুনিক প্রযুক্তি বিস্তৃত করেছে। শিশুরা এখন জানুয়ারি মাসের শুরুতে বিনামূল্যে বই পায়। মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে এ সরকার। শিশুপাচার বন্ধে আইন করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। আমাদের পরিবারকে পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা ধানমণ্ডিতে বন্দি করে রেখেছিল। সে সময়ও রাসেল কিছু বুঝতো না। শুধু কষ্ট পেতো, বাবাকে খুঁজতো, খেলতে পারতো না বলেও কষ্ট পেতো। ১৭ ডিসেম্বর আমরা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হই। এরপর রাসেল যখন গ্রামে যেতো তখন ঢাকা থেকে জামা-কাপড় নিয়ে যেত। সেগুলো গ্রামের শিশুদের দিয়ে দিতো। গরিব শিশুদের কখনও রাসেল অবহেলা করতো না। সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, খেলতো।




