বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। শনিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে এ হরতাল হবে।
বিএনপির এই সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ফলে সারাদেশে রোববার ভোর ছ’টা থেকে টানা দু’দিন হরতালের ঘোষণা হয়ে গেলো। কেননা, মানবতাবিরোধী অপরাধে দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ’ দেওয়া প্রতিবাদে গত বুধবার ৪৮ ঘণ্টা হরতালের ঘোষণা দেয় জামায়াত।
সেই ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার ভোর ছ’টা থেকে শুক্রবার ভোর ছ’টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা হরতাল হয়। দ্বিতীয় দফায় রোববার ভোর ছ’টা থেকে সোমবার ভোর ছ’টা পর্যন্ত হরতাল হবে জামায়াতের। কার্যত জামায়াতের হরতাল শেষ হওয়া মাত্র সোমবার ভোর ছ’টা থেকে শুরু হবে বিএনপির হরতাল। এর ফলে টানা দু’দিনে সারাদেশ হরতাল পরিস্থিতি তৈরি হলো। এর আগে দুপুরে নয়াপল্টনে ২০ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে হরতালের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। সেখান থেকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে মির্জা ফখরুল হরতালের ঘোষণা দেন।
২০ দলীয় জোটের মহাসচিবদের পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, গণবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের কাছে অর্পন করেছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ, অভিশংসন ক্ষমতা এমন একটি সংসদের কাছে অর্পণ করা হলো যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ১৫৪ জন সংসদ সদস্যকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা এবং ৫ শতাংশ ভোটে অবশিষ্ট আসনে শুধু ক্ষমতাসীন মহাজোটের সদস্যদের নির্বাচিত ঘোষণা করার মাধ্যমে গঠিত এই অনৈতিক ও অবৈধ পার্লামেন্টের কোনও এখতিয়ার নেই সংবিধান সংশোধন করার। এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ। বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খার পরিপন্থি। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা একটি দলের, আওয়ামী লীগের অধীনে চলে গেলো এবং বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা এখন থেকে আওয়ামী লীগের।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের একটি প্রধান প্রতিষ্ঠান স্বাধীন বিচার বিভাগ, সেটাও দলীয়করণ চূড়ান্ত হলো। এই সংশোধনীর ফলে বিচারপতিদের ওপর যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হবে, তাতে করে জনগণের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবার আশংকা সব সময়ই থাকবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীতে প্রয়াত: শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করেছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে Supreme Judicial Council গঠন করেছিলেন। যা এতদিন পর্যন্ত বলবৎ ছিল। এ ব্যবস্থায় কোনও পক্ষ থেকে কোনও আপত্তি বা বিতর্ক উঠেনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, আওয়ামী লীগ বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার আয়োজন সম্পূর্ণ করেছে। দেশের বরেণ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা কেউই এই সংশোধনী সমর্থন করেননি। সবাই মনে করেন, আওয়ামী লীগ তাদের একদলীয় শাসন পাকাপোক্ত করা এবং একনায়কতন্ত্রকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই এই সংশোধনী পাশ করিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এর আগেও এর নিন্দা জানিয়েছি এবং প্রতিবাদ করেছি। এই অনৈতিক সরকার কোনও কথাতেই কর্ণপাত করেনি, এমন কি বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও গ্রহণ করেনি। তাদের মূল উদ্দেশ্য মুক্ত বহুদলীয় গণতন্ত্রকে গলা টিপে তাদের দলীয় শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া এবং বেআইনি-অনৈতিক-অবৈধ শাসনকে পাকাপোক্ত করা।
ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ এই সংশোধনী মেনে নিতে পারে না। ২০ দলের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষ হতে আমরা এই সংশোধানীর তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং এই সংশোধনী বাতিলের দাবিতে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রোজ সোমবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
তবে হজ্বযাত্রীদের যানবাহন, খাওয়ার হোটেল, ঔষধের দোকান, ফায়ার ব্রিগেট, অ্যাম্বুলেন্স এবং সংবাদ মাধ্যম এবং সাংবাদিকদের বহনকারী যানবাহন ও লাশ বহনকারী গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।




