আহত হন কয়েকশ’ মানুষ। আহতদের যারা বেঁচে আছেন তারাও প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। এদের মধ্যে অনেকেই চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে গেছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘটনার সময় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ছিলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের মানুরী গ্রামের সাইফুদ্দিন আহমেদ। তখন তিনি সবেমাত্র উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশুনা শেষ করেছেন।

১০ বছর আগের সেদিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রচুর নেতা-কর্মী এসেছিলো সেদিন। শেখ হাসিনার বক্তব্য যখন শেষ দিকে তখনই গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে।
বিস্ফোরণের পর চারদিকে আর্তনাদ। যেদিকে পেরেছেন ছুটেছেন। আমি নিজেও ছুটতে থাকি। ছুটে গিয়ে কোনো রকমে পীর ইয়ামেনী মার্কেটের ঢুকে পড়ি। এরই মধ্যে মার্কেটের গেট লাগিয়ে দেওয়া হয়।
তারপর দেখলাম সবাই ছুটছে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে।গ্রেনেড বিস্ফোরণের কিছু সময় পরেই পীর ইয়ামেনী মার্কেট থেকে বের হলাম। এরপর যা দেখলাম সেটা মুখে বলে বোঝানো যাবে না।
রাস্তায় পড়ে আছে গ্রেনেডে ক্ষতবিক্ষত লাশ। গ্রেনেডে আহতরা রাস্তায় কাতরাচ্ছেন। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। রাস্তায় মানুষের ছিন্ন ভিন্ন হাত-পা পড়ে থাকতে দেখেছি। আহতদের রক্তে রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। রাস্তায় রক্তের দাগ। রাস্তার এখানে সেখানে পড়ে আছে রক্ত মাখা জুতো। চারদিকে শুধুই আহতদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল।
তিনি বলেন, সেদিনের কথা মনে হলে আজো গা শিউরে ওঠে। শুধু সাইফুদ্দিন নয় আজো অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেনেডের স্প্রিন্টার। এদেরই একজন রাশেদা আক্তার রুমা। ৩৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর মহিলা লীগের সদস্য। সেদিনের ভয়াল স্মৃতির কথা মনে করে তিনি বলেন, শরীরে স্প্রিন্টারের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করা যায় না। জীবিত থাকতেই মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছি। সেদিন মরে গেলে আজ দশ বছর পূর্ণ হত। এখন মনে হয়, মরে যাওয়াই ভালো ছিল।
গ্রেনেড হামলার ১০ বছরে রাশেদা আক্তার রুমার শরীরে শরীরে অসংখ্য স্প্রিন্টারের ক্ষত রয়ে গেছে। তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে মাঝে মধ্যে তিনি নিজেকে ঠিক রাখতে পারেন না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে থাকা স্প্রিন্টারের যন্ত্রণাও বেড়ে যাচ্ছে তার। একটি কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। কানেও ভাল শুনতে পান না বলে জানান তিনি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী সমাবেশে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার ঠিক আগ মহূর্তে গগণ বিদারী শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে প্রাণঘাতী গ্রেনেড। সেই সঙ্গে চলে গুলিবর্ষণও।
শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য। নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে তার বুলেটপ্রুফ গাড়িতে তুলে ধানমন্ডির সুধা সদনে নিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও স্থায়ীভাবে ক্ষতি হয় তার শ্রবণ শক্তির। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনা।
এ বিষয়ে শেখ হাসিনাও বলেন, আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। সেদিনের সেই কলঙ্কিত হামলায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মহিলা বিষয়ক সম্পাদিক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দলের সবার কাছে আদা চাচা নামে পরিচিত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম।
অন্য নিহতরা হলেন, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স কর্পোরাল মাহবুবুর রশীদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী সুফিয়া বেগম, মাদারীপুরের যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, নারায়ণগঞ্জের রতন সিকদার, ঢাকা মহানগর রিকশা শ্রমিক লীগ নেতা মো. হানিফ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী হাসিনা মমতাজ রীনা, সরকারি কবি নজরুল ইসলাম কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মামুন মৃধা, ঢাকা মহানগর যুবলীগ নেতা বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগকর্মী আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, যুবলীগ নেতা আতিক সরকার, শ্রমিক লীগকর্মী নাসির উদ্দিন সর্দার, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেত্রী রেজিয়া বেগম, আবুল কাসেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, যুবলীগ নেতা শামসুদ্দিন আবুল কালাম আজাদ ও ইছহাক মিয়া।

বিএনপি আমলে এ মামলার তদন্ত নিয়ে জজ মিয়া নাটক সাজানোর অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তদন্তে উন্মেচিত হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে গ্রেনেড হামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। সেই সময়ের তদন্ত কর্মকর্তারাও এখন আসামি।
এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের ছেলে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ মোট ৫২ জন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিচার এখনো চলছে।
কর্মসূচি
প্রতিবারের মতো এবারো যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করবে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের নেতা-কর্মীরা।
২১ আগস্টের নিহতদের স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং আলোচনা সভায় অংশ নেবেন। আওয়ামী লীগ ছাড়াও এর সহযোগী সংগঠনগুলো এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে যুবলীগ ২১ আগস্টের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ০১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেছে।




