রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়চীন থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে : শেখ হাসিনা

চীন থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে : শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, চীনে তাঁর বর্তমান সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন পথ উন্মোচিত হবে। আমার চীন সফর একটি বিরাট সাফল্য। এখন থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অতীতের চেয়ে আরো বেশি গুরুত্ব পাবে। সোমবার বেইজিংয়ে ‘সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সাফল্য এবং চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে চীনের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিআইআইএস) বেইজিংয়ে তার নিজস্ব কার্যালয়ে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত-চীন-মায়ানমার (বিআইসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠায় চীনের প্রস্তাবের প্রতি বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। এক সময়ের জনপ্রিয় ‘সিল্ক রুট’ হিসাবে পরিচিত এই করিডোরের ফলে নেপাল ও ভুটানসহ এ অঞ্চলের সব দেশের জনগণ লাভবান হবে।

স্বল্প সময়ে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতির প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, চীনের সাম্প্রতিক উন্নয়নে তিনি অভিভূত। চীন থেকে বাংলাদেশে অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

এসময় সিআইআইএস-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক কুটনীতিক রুয়ান জংঝে তার স্বাগত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে সাফল্যের বর্ণনা দেন। রুয়ান জংঝে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারের জন্য তাঁর প্রশংসা করেন।

এ প্রশ্নোত্তর পর্বে পিপলস ডেইলি ও শেন জেন টেলিভিশনের সাংবাদিক এবং চায়না কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটির (সিসিইউ) ফ্যাকাল্টির সদস্যসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ এবং জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগসহ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

এসময় সিআইআইএস সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষার বিপুল সংখ্যক সাবেক ছাত্র-ছাত্রী এবং উভয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ও চীনা ভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর লিখিত ভাষণে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চীনের অব্যাহত সমর্থনের প্রশংসা করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে এ দেশের জনগণের লড়াইয়ে চীন আরো সমর্থন ও সহযোগিতা দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

২০১১ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব ‘বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি মডেল’ বলে যে মন্তব্য করেছেন তার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বক্তব্য তাঁর সরকারকে ‘রূপকল্প-২০২১’ কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করেছে।

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমাদের সরকার তার পূর্ণাঙ্গ অঙ্গীকার ও নিষ্ঠাসহ এ লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে এবং বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও শান্তির দিকে এগিয়ে যাবে। আমি জানি, আমরা আমাদের বন্ধুদের বিশেষ করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং সহযোগিতায় সাফল্য লাভ করব।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সাফল্য এবং বাংলাদেশ-চীন ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের অংশীদারিত্ব এবং প্রাচীন কাল থেকে ব্যবসা ও ভ্রমণের মাধ্যমে জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠতর হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনের যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করতে আগ্রহী আমরা তাদেরকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করবো। চীনও বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

চীনকে সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো আদর্শিক ও আঞ্চলিক পক্ষপাত ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থে কার্যকর যে কোনো ইস্যুকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে আসছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সম্প্রীতির সমাজ গড়ার চীনের নীতির প্রতি পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে আসছে। জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গভীরভাবে আগ্রহী।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, শিল্প ও কৃষি, পানিসম্পদ, বন্যা পূর্বাভাস, ভূমিকম্প সতর্কবার্তা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং জননিরাপত্তা পর্যন্ত এ সহযোগিতা বিস্তৃত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ১৭টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। ফলে ২০০৭ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও আমদানির উৎসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ বাণিজ্য খুবই ভারসাম্যহীন। বাংলাদেশ চীন থেকে ৬শ’ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশ থেকে চীনে রফতানির পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারেরও কম।

বাণিজ্যিক ব্যবধান কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সালের ২১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন থেকে ২০১২ সালে ১৮১ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে চীনের ৪৯টি কোম্পানী বাংলাদেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে ৩১ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের অনুদান ও সহায়তা পেয়েছে ২৬৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। একই সময় ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ৭৩১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। চীনের এসব অনুদান, সাহায্য ও সহজ শর্তের ঋণ বাংলাদেশে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। এছাড়া আরও ৬টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ১৪টি অগ্রাধিকার প্রকল্প সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা বিবেচনার জন্য চীন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ- চীন- ভারত- মায়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (বিসিআইএম-ইসি) ব্যাপারে চীনের সক্রিয় ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই গ্রুপের প্রথম স্টাডি বৈঠকে যোগাযোগ, পণ্য বাণিজ্য, সেবা ও বিনিয়োগ, পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন এবং জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগকে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের বাংলার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সুপ্রাচীন। এ সম্পর্কের সূচনা হয় দক্ষিণের সিল্ক রুটে বাণিজ্য ও ভ্রমণ এবং আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের মধ্যে পণ্য, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে।

তিনি তাইওয়ান ও তিব্বত ইস্যুতে ‘এক চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ প্রগতিশীল এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি বলেন, আমাদের ১৬ কোটি মানুষ এসব নীতিমালা রক্ষা করতে সংকল্পবদ্ধ।

বাংলাদেশের সকল ধর্মের লোক শান্তি-সমৃদ্ধির সঙ্গে বসবাস করতে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গণতান্ত্রিক আধুনিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে প্রতিশ্রতিবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ