সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদদেশজুড়েইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ

ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে শঙ্কার প্রেক্ষাপটে এবার সরব হয়েছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গভর্নরের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে সংগঠনটি। এতে ব্যাংকের অতীত সুনাম ও গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অবিলম্বে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার, দোষীদের বিচার এবং ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগ এবং জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যের পর গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

এর ফলে অনেক গ্রাহক আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে অর্থ উত্তোলনে ভিড় করেন। এতে কিছু শাখায় নগদ অর্থ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ অবস্থায় দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।

স্মারকলিপিতে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে গ্রাহকরা হতাশ।

তাদের দাবি, ব্যাংকটির সংকট ক্রমেই প্রকট হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট হয়েছে, যা গ্রাহকদের আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাকে গ্রাহকরা এখনও একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে দেখেন। তাদের অভিযোগ, সে সময় শেয়ারহোল্ডারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করা হয়। পরে ব্যাংক থেকে বিভিন্ন উপায়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়।

গ্রাহকদের মতে, ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যাপক ঋণ বিতরণ, বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থায়ন এবং নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।

সচেতন গ্রাহক ফোরামের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসায় ব্যাংকে আমানত প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। গত প্রায় দুই বছরে ব্যাংকটিতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত জমা পড়ে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে নতুন বিতর্ক এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সেই আস্থার ভিত্তি আবারও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।

স্মারকলিপিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, একটি বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তে একজন প্রশাসকের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা দীর্ঘমেয়াদে সুশাসনের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না।

গ্রাহকদের আশঙ্কা, এই সুযোগে অতীতে ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা হতে পারে। তাই তারা অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

স্মারকলিপিতে ইসলামী ব্যাংকের অতীত সাফল্যের কথাও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকটি শুধু দেশের নয়, এশিয়ার অন্যতম সফল ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আমানত, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী আয় সংগ্রহ এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির অবস্থান ছিল শীর্ষ পর্যায়ে।

একসময় দেশের মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসত এবং গ্রাহকদের আস্থা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে বিনিয়োগের চাহিদা পূরণের পরও ব্যাংকে বিপুল উদ্বৃত্ত তহবিল থাকতো।

স্মারকলিপিতে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

স্মারকলিপির শেষ অংশে গ্রাহকরা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি কোটি কোটি আমানতকারীর বিশ্বাস, আবেগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক।

তারা সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সাধারণ গ্রাহকরা আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে আস্থা, সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং পুরো আর্থিক খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ