সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়বাজেট ২০২৬-২৭: কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম

বাজেট ২০২৬-২৭: কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে সরকার। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য নজিরবিহীন করছাড়, ভ্যাট অব্যাহতি এবং আমদানি পর্যায়ে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বেশ কিছু আমদানিনির্ভর ও বিলাসী পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে ‘উৎপাদনমুখী করনীতি’। অর্থাৎ যারা দেশে উৎপাদন করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং রফতানি বাড়াবে, তারা কর সুবিধা পাবে। অপরদিকে যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি হয় এবং দেশীয় শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, সেসব পণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানো হবে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, চিকিৎসাসামগ্রী, মোবাইল ফোন, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব আসতে পারে; এতে কমতে পারে এসব পণ্যের দাম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট উত্থাপন করা হবে আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। এদিন বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করবেন। এটি পাস হলে এটি হবে দেশের ৫৫তম, বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।

জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ। এছাড়া মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ এদিকে, বাজেটে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে সরকার। এডিপিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। আর ঋণ সহায়তা বা বিদেশি অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় করছাড়ের বড় ধরনের সুবিধা দেয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু কর অব্যাহতি বা করছাড়ই নয়, বরং ভ্যাট এবং পণ্য আমদানির শুল্ক-করেও উল্লেখযোগ্য ছাড় দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মূলত দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতেই এই করছাড় দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক্স খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হতে পারে এবং এই খাতে সর্বোচ্চ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে এই করছাড় বা কর অব্যাহতির সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানা গেছে।

দাম কমতে পারে যেসব পণ্যের

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হতে পারে। রেগুলেটরি শুল্কের স্তর ৯টি থেকে কমিয়ে ৬টিতে আনা হতে পারে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য

বাজারের মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য কমাতে চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। একই সঙ্গে এসব পণ্যে রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হতে পারে।

বর্তমানে মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য আমদানি বা সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ হারে উৎসে কর পরিশোধ করতে হয়। নতুন বাজেটে এসব হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব আসতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত করের চাপ কমলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

ভোজ্যতেল

দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী ব্যবসায়ের জন্য আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ কর হারের প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা বা অন্যান্য তৈলবীজের তেলের দাম ভবিষ্যতে আরও সাশ্রয়ী হতে পারে।

জ্বালানি তেল

রিফাইনারি বা শোধনাগার কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১.৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে। এতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ কমাতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।

চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধ

কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। এতে কিডনি রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিসে খরচ প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৬৮টি কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব আসতে পারে। এছাড়া ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা দেয়া হতে পারে।

হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হতে পারে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

মোবাইল ফোন ও টেলিযোগাযোগ খাত

স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২টি কাঁচামালের ওপর উৎসে কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। পাশাপাশি এ খাতে মূসক অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।

মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার কর বাতিল করা হতে পারে; ফলে সিমের দাম কমবে। এছাড়া বিটিআরসির প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে।

বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা বহাল থাকতে পারে। সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতেও ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতির প্রস্তাব আসতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা 

জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে উৎসাহ দিতে সৌর বিদ্যুৎ ও ব্যাটারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে করমুক্ত সুবিধা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনেও করছাড় অব্যাহত থাকবে।

ফলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমবে এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ি 

পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার।

এতে আগামী বছরগুলোতে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।

কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় সুখবর 

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর থাকা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং ৭ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইউটিউবার, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা এবং অনলাইন সৃজনশীল পেশাজীবীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।

স্বর্ণালঙ্কারের দামও কমতে পারে 

স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে ৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হতে পারে। জুয়েলারি সেবার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। এতে কমতে পারে স্বর্ণের দাম।

ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য

টেলিভিশন, ফ্রিজ ও কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনে বিদ্যমান কর অব্যাহতি সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে।

এছাড়া এটিএম কার্ডসহ সব ধরনের কার্ড তৈরির কাঁচামাল আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার হতে পারে। পাশাপাশি ১১৩টি পণ্যের ওপর থেকে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে।

অন্যান্য পণ্য ও খাত

বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানির ওপর থাকা ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে।

ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫টি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও কর প্রত্যাহার করা হতে পারে।

প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হতে পারে। পরিবহন, ক্যারিং ও গাড়ি ভাড়া সেবা খাতে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে। রিসাইকেলড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালের করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ