সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়এ'মাসেই মালয়েশিয়া এবং চীনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

এ’মাসেই মালয়েশিয়া এবং চীনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফর মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা এ নিশ্চিত করেছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক প্রথম বিদেশ সফরে কোন দেশে যাবেন, তা নিয়ে গত তিন মাস নানা আলোচনা চলছিল। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এই অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে সরকারপ্রধান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় প্রথম সফর বেছে নিলেন। এরপর তিনি যাবেন চীনে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের মালয়েশিয়া যাওয়ার সূচি ঠিক হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২১ থেকে ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর সফর করবেন। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন সরকারপ্রধানের চীন সফরের দিনক্ষণ ঠিক করা আছে। প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিং যাবেন, নাকি ঢাকায় ফিরে বেইজিং যাবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে চিঠি দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দুই দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২২ জুন দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি আয়োজনের বিষয়ে কথা চলছে।

সূত্রগুলো বলছে, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। সে কারণে দিল্লি বা বেইজিংয়ের পরিবর্তে তৃতীয় একটি দেশকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা শ্রমবাজারের জট খুলতে পারে। ফের বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশীয় শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা আসতে পারে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় কোনো উপলক্ষ্য ধরে সাধারণত সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরের সিদ্ধান্ত হয়। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ার সফরের বড় একটি উপলক্ষ্য হতে পারে শ্রমবাজার চালুর বিষয়টি।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে যাবেন এটা জানি। শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে এখনো কোনো খবর জানা নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষ্যে এটি হতেও পারে।

শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, শ্রমবাজারটা খুলে যাবে। ১০-১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য মালয়েশিয়া সফর প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তথ্য তার কাছে নেই। তবে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুতই পরিষ্কার হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বন্ধ বাংলাদেশের। ওই বছর মালয়েশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছিল, আগে থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের কর্মীদের ৩১ মে-এর মধ্যে দেশটিতে যেতে হবে। এরপর কর্মী ভিসায় আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। ওই তারিখের পর থেকে আর কোনো কর্মী যেতে পারেননি দেশটিতে। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দফায়-দফায় চেষ্টা করেও এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে পারেনি।

বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ এই জনশক্তি বাজার আবার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দ্রুতই বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজারটি খোলার কথা বলে আসছেন।

বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৮ এবং ২০২২ সালে সই করা সমঝোতায় স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হওয়া দেশটির শ্রমবাজার এখনও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলেনি।

দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবার শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি আশার আলো দেখালেও রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ, ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, আবারও সিন্ডিকেটের কবলেই পড়তে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন না করলে সিন্ডিকেট সুযোগ নেবেই।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে বরাবরই সরব অবস্থানের বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। রীতিমতো তিনি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সুযোগ দেওয়া হবে না। আমি যদি মন্ত্রী থাকি, এখানে কোনো সিন্ডিকেট হবে না। জিরো টলারেন্স।

২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ