রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনপটিয়ায় বিতর্কিত এনামকে বিএনপির মনোনয়ন, তৃণমূলে অসন্তোষ

পটিয়ায় বিতর্কিত এনামকে বিএনপির মনোনয়ন, তৃণমূলে অসন্তোষ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চট্টগ্রামের পটিয়া আসনে মোহাম্মদ এনামুল হক এনামকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলন ও সংগ্রামে সক্রিয়, ত্যাগী নেতাদের উপেক্ষা করে বিতর্কিত ও অতীতে দল থেকে বহিষ্কৃত একজন নেতাকে প্রার্থী করায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

৩ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৩৭ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১০টিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। ওই প্রার্থী তালিকায় চট্টগ্রাম–১২ আসনে মোহাম্মদ এনামুল হকের নাম রয়েছে।

ঘোষণার পরপরই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পটিয়ার তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া ঝড় তোলে। অনেকেই এনামুল হক এনামের মনোনয়ন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জনপ্রিয় তিন ইউটিউবার এনামুল হক এনামের নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার পরপরই তাদের স্ব-স্ব ভেরিফাইড ফেসবুকে পেজে স্ট্যাটাস দেন। এতে মুহূর্তে ভাইরাল হয়।

ফ্রান্স থেকে জনপ্রিয় ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘সবই এস আলম খেলা! জুলাই বিপ্লবের পর এস আলমের গাড়ি নিরাপদে সরানোর ঘটনায় অভিযুক্ত মোহাম্মদ এনামুল হককে বিএনপি সাময়িক বহিষ্কার করলেও, দুই মাস পরই ফিরিয়ে এনে চট্টগ্রাম-১২ আসনে প্রার্থী করেছে।

আরেক জনপ্রিয় ইউটিউবার জেকব মিল্টন মন্তব্য করেছেন, ‘তারেক রহমানের কাছে নীতি নয়, নোটই বড়। এস আলমের গাড়ি কেলেঙ্কারির নেতা এনামুল হক টাকার জোরে আবার মনোনয়ন পেয়েছেন।’ ইলিয়াছ হোসাইন লিখেছেন, ‘এস আলমের গাড়ি কাণ্ডে বহিষ্কৃত এনামকে আবার মনোনয়ন দেওয়ায় তারেক রহমানকে জিন্দাবাদ’।

ফেজবুকে মীর জাহান নামের একজন লিখেছেন, এস আলমের গাড়ি কাণ্ডে বহিষ্কৃত নেতা এনামকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এমন সিদ্ধান্তে হাসছে মানুষ, কাঁদছে তৃণমূল।’ আরেকজন, আবদু ওয়াহিদ মুরাদ মন্তব্য করেন, ‘বিতর্কিত নেতাদের টাকা আর প্রভাবই কি এখন বিএনপির যোগ্যতার মাপকাঠি?

মুহাম্মদ মাসুম ওই পোস্টে মন্তব্য করেছেন, ‘আবিষ্কারের পর বহিষ্কার।’ খোয়াজি মুস্তফা মন্তব্য করেছেন, ‘এখন তো তারেক রহমান সাহেব সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতিবাজদের লালন করছেন।’ মীর জাহানের পোস্টকে ঘিরে চার হাজারের বেশি মানুষ মন্তব্য করেছেন, যাদের অধিকাংশই দল ও তারেক রহমানকে নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

গত ২৯ আগস্ট রাতে এস আলম গ্রুপের ওয়্যারহাউজ থেকে বিলাসবহুল ১৪টি গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনামসহ তিনজনের দলীয় পদ ২ সেপ্টেম্বর স্থগিত করা হয়। তবে গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে এনামুলসহ তিন নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের ছেলের শ্বশুর মীর গ্রুপের আবদুস সালাম এনামুল হক এনামের মামাতো ভাই।

গত ৮ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ কলিম উল্লাহ চৌধুরী। অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্টের পর পটিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব খোরশেদ আলম দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কল-কারখানায় চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। খোরশেদ এনামুল হকের অনুসারি। তিনি দাবি করেন, এস আলম গাড়ি কাণ্ডে’ খোরশেদ আলম নিজেই এক সংবাদ সম্মেলনে এসব স্বীকার করেছেন।

গত ৫ আগস্টের পর পটিয়া থানায় বিএনপির দায়ের করা একটি মামলায় আসামি হন জাতীয় শ্রমিক লীগ সভাপতি সামশুল ইসলাম। মামলায় শীর্ষস্থানীয় ওই আওয়ামী লীগ নেতার নাম অন্তর্ভুক্তিকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব খোরশেদ আলম। একই সঙ্গে ওই নেতাকে গ্রেপ্তার না করা ও ভবিষ্যতে কোনো মামলায় আসামি না করার গ্যারান্টিও দেন তিনি— যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি অডিও ক্লিপ থেকে জানা গেছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এনামুল হকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী। তারা অভিযোগ করেন, এনামুল হক একজন খাতুনগঞ্জে চাল ব্যবসায়ি হিসেবে পরিচিত। গত ফ্যাসিবাদি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সুকৌশলে রাজনীতি করেছেন। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা নানাভাবে মামলা ও হামলাসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

স্থানীয় বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা আন্দোলনের সময় ঘরে ছিলেন, তারা আজ প্রার্থী। যারা মামলা খেয়ে রাস্তায় ছিলেন, তাদের কেউ দলীয় মূল্যায়ন পেলেন না। এতে দলের শীর্ষ নেতা ও তৃণমূল কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে।

বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়ায় নির্বাচনের মাঠে কর্মীরা নিরুৎসাহিত হবে, এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা বলেন, দলের দুঃসময়ে যার ত্যাগ, মামলা, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদী ও কৌশলী নীতিবান নেতার হাতে নির্বাচনের মনোনয়ন দেওয়ায় দলের মধ্যে বিভাজন বাড়াবে এবং নির্বাচনে দলের বিপদ ডেকে আনবে। কেন্দ্র বলে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা উল্টো। ফলে দলের আগামী সংসদ নির্বাচনের ভোটের লড়াইয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ