ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা যে বিবৃতি দিচ্ছেন, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না। এটি দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে একটি ক্ষুদ্র প্রতিবন্ধক।
মিশ্রী বলেন, ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের সাথে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই সম্পর্কের ভিত্তি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেই নিহিত। তিনি জানান, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে কোনো আলাদা প্ল্যাটফর্ম প্রদান করেনি, বরং হাসিনা তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এইসব মন্তব্য করে চলেছেন।
মিশ্রী আরও বলেন, ঢাকায় তার সফরের সময় তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জানিয়েছেন, ভারত জনগণের সাথে সম্পর্ক অগ্রাধিকার দেয় এবং বর্তমান সরকারের সাথে কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক।
তিনি জানান, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা গুলো নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এক ধরনের অস্বীকৃতি রয়েছে যা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই হামলা গুলোকে আওয়ামী লীগের উপর হামলা বলে যুক্তি দেখালেও মিশ্রী ব্যাখ্যা করেন, এমন যুক্তি এই ধরনের আক্রমণের ‘ন্যায্যতা’ প্রমাণ করতে পারে না।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবরে এ তথ্য বলা হয়েছে। বিক্রম মিশ্রি গত সোমবার ঢাকা সফর করেন। সফরে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিক্রম মিশ্রি। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বিক্রম মিশ্রি তাঁর ঢাকা সফর নিয়ে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে ব্রিফ করেন। ওই ব্রিফিংয়ে ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যক্রমের বিষয়ে এ কথা বলেন তিনি। নয়াদিল্লির সংসদ ভবনের অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ব্রিফে দেশটির ২১ থেকে ২২ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কেবল একটি “একক রাজনৈতিক দল” বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং “বাংলাদেশের জনগণের” ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ভারত। শেখ হাসিনা তার “ব্যক্তিগত যোগাযোগের ডিভাইস” ব্যবহার করে এসব বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে চলেছেন এবং ভারত সরকার তাকে এমন কোনও প্ল্যাটফর্ম বা সুবিধা প্রদান করছে না যা তাকে ভারতের মাটি থেকে তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালানোর সুযোগ দেয়। তিনি দাবি করেন, অন্য দেশে হস্তক্ষেপ এড়ানোর জন্য ভারতের ঐতিহ্যবাহী যে রীতি রয়েছে, এটি তারই অংশ।
দ্য হিন্দু বলছে, পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির এমন মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে প্রায় নানা ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন হাসিনা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মিশ্রি আরও জানান, সোমবার ঢাকা সফরের সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে জানিয়েছেন- বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক “কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল” বা একটি নির্দিষ্ট সরকারের বাইরেও আছে এবং ভারত বাংলাদেশের জনগণের সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয় এবং বর্তমান সরকারের সাথেও জড়িত থাকবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পক্ষ রেল যোগাযোগ, বাস সংযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ নির্মাণ করেছে। তিনি অবশ্য কমিটিকে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী রেল পরিষেবা এখনও “স্থগিতই” রয়ে গেছে।
চলতি বছরের আগস্টে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিত্র শেখ হাসিনা। এরপর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে এরপরও হাসিনা ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে নানা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে চলছে টানাপোড়েন।




