সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদআরো খবর......১৮ দলের অবরোধ: সারাদেশে বিভিন্ন জায়াগায় বিছিন্নভাবে সহিংস ঘটনা

১৮ দলের অবরোধ: সারাদেশে বিভিন্ন জায়াগায় বিছিন্নভাবে সহিংস ঘটনা

ন্যাশনাল ডেস্কঃ (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের টানা ৪৮ ঘণ্টার রাজপথ, রেলপথ ও নৌ-পথ অবরোধের দ্বিতীয় দিন বুধবার রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন জায়াগায় বিছিন্নভাবে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুর, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যসহ ৬ জন নিহত হয়েছেন।এ নিয়ে অবরোধের দুই দিনে সহিংসতায় বিজিবি সদস্য, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাসহ এ পর্যন্ত ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

১৮জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। পুলিশ এ সময় ৫০ জনকে আটক করেছে। এ ছাড়া চাঁদপুর ও সিরাজগঞ্জে রেলপথে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে।ঢাকায় অবরোধের প্রথম দিনে ককটেল হামলায় আহত ন্যাশনাল ব্যাংকের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আনোয়ারা বেগম  ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।

সিরাজগঞ্জ : জেলার বেলকুচিতে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে ঘন্টাব্যাপী সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা ছাত্রদল ও জামায়াত কর্মী বলে জানা যায়। এ ঘটনায় পুলিশসহ আরো ২০ জন আহত হয়। নিহতারা হলেন- জামায়াত কর্মী আব্দুল জলিল (৫৫) ও ছাত্রদল কর্মী মাসুম বিল্লাহ। সকাল ১১টায় মুকুন্দগাতী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

সূত্র জানায়, সকাল ১১টার দিকে বেলকুচির কল্যাণপুর থেকে বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীরা প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মুকুন্দগাতী বাজারে এসে অবরোধের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এ সময় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরে আইন শৃঙ্খখলা বাহিনীর সদস্যরা এসে আওয়ামীলীগের সাথে যোগ দেয়।সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুহয আব্দুল জলিলের।

প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী সংষর্ঘ চলাকালে তিন জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত আরো ২০জন আহত হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যায় মাসুম বিল্লাহ।

নারায়ণগঞ্জ : সোনারগাঁয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকায় বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত সাতজন গুলিবিদ্ধসহ ২৫জন আহত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৪ জনকে আটক করেছে। বুধবার সাকালে এ ঘটনা  ঘটে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সকালে সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের নেতৃত্বে মেঘনাঘাট এলাকায় অবরোধ সমর্থনে একটি মিছিল বের করে। খবর পেয়ে সোনারগাঁও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে আবারও শুরু হয় সংঘর্ষ। সকাল থেকে কয়েক দফা সংঘর্ষে মেঘনাঘাট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ ও আহতদের সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া এলাকাতে একটি গ্যারেজের সামনে রাখা পুলিশের পিকআপ ভ্যানে সকালে পেট্রোলবোমা মারলে আগুনে ওই ভ্যানটি পুড়ে যায়। এছাড়া ১০/১২টি যানবাহন ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় অবরোধকারীরা।

চট্টগ্রাম : বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে তিন পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। সকালে বন্দর থানার নিমতলা এলাকায় চট্টগ্রামের ইপিজেড থেকে আসা বিএনপি ছাত্রদলের একটি মিছিলে পুলিশ বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন ১০ জন। এ ছাড়া সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২০ থেকে ২৫ জন। এই ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র ৩৬ নং ওয়ার্ডের সভাপতি জাহিদুল আলমসহ ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

সকালে বহদ্দারহাট, কর্নেল হাট, ওয়াসা মোড় এসব স্থানে অবরোধকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় যানবাহন ভাঙচুর এবং আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। কর্নেলহাটে সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত একজনের অবস্থা আশংকাজনক বলে জানা গেছে।

এছাড়া অলংকার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। সকাল দশটা থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের ঘটনায় পর্যন্ত প্রায় ২০ জন আহত হয়েছে।

সাতক্ষীরা : সদর উপজেলায় পুলিশ ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় পুলিশের গুলিতে এক জামায়াতকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ভোর রাত তিনটার দিকে সদর উপজেলার আগরদাড়ি ইউনিয়নের আবাদের হাটখোলায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম শামসুর রহমান (৩৫)। তিনি শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে।

সূত্র জানায়, রাত তিনটার দিকে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যের একটি যৌথ বাহিনী আসামি ধরতে সদরের আগরদাড়ি মাদ্রাসা এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মসজিদে মাইকিং করে শত শত গ্রামবাসী সড়কে নেমে আসে। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ করে।

এ সময় তারা যৌথ বাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেল ছোড়েন। আত্মরক্ষার্থে কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোড়ে যৌথ বাহিনী। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শামসুর রহমান নিহত হন।

দুপুরে অবরোধ করার জন্য গাছ কাটতে গিয়ে গাছের নিচে পড়ে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

রাজশাহী : অবরোধ ও আধাবেলার হরতাল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী নগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, তিন পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ১১ জনকে আটক করেছে।

চাঁদপুর : শহরের চিত্রলেখা মোড়ে ও হাজীগঞ্জ বাজারে অবরোধকারীদের সঙ্গে সকালে পুলিশের কয়েক দফা সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়। এসব ঘটনায় ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।
অবরোধকারীরা চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের বাকিলা থেকে বলাখাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকার কয়েক’শ গাছ, গাছের গুঁড়ি ও পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। শহরের মিশন রোড এলাকায় রেললাইনে আগুন এবং চাঁদপুর-লাকসাম রেললাইনের মেহের স্টেশনের এক কিলোমিটার পশ্চিমে ৬০ ফুট দীর্ঘ রেলের একটি পাত তুলে ফেলে অবরোধকারীরা। পরে রেললাইন মেরামত করা হয়।

খুলনা : বিএনপি-পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সকাল আটটা থেকে শুরু হয়ে এ সংঘর্ষ ৯টা ২০মিনিট পর্যন্ত চলে। নগরীর পিটিআই মোড় থেকে মৌলভীপাড়া, টিভি বাউন্ডারি রোড, মডার্ন ফানির্চারের মোড়, বড় মির্জাপুর রোড ও সিটি কলেজ পর্যন্ত সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

এসব এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ বিএনপি কর্মীদের পিছু হঠাতে ফাঁকাগুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে দুই পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১৫জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই বিএনপি কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করেছে।

আটককৃতরা হলেন, মহানগর বিএনপি সভাপতি ও সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনির নেতৃত্বে পিটিআই মোড় থেকে একটি মিছিল বের হয়। পুলিশ মিছিলে বাধা দিলে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়।

পুলিশের দাবি, বিএনপি কর্মীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের দুইজন সদস্য আহত হন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই শতাধিক রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

বরিশাল : সকালে অবরোধকারীদের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় কয়েকশ রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন আনেপুলিশ।

জেলার কাশিপুর বাজার এলাকায় সকাল পৌনে আটটার দিকে ছাত্রদলের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। পুলিশ ওই মিছিলে বাধা দিলে কর্মীরা মারমুখি হয়ে ওঠে। শুরু হয় পুলিশ-ছাত্রদল সংঘর্ষ। টিয়ার সেল ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে পুলিশ কয়েক শত রাউন্ড রাবার বুলেট ব্যবহার করে। পুলিশের লাঠিচার্জে ওই মিছিলে অংশগ্রহনকারী বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান ফারুকসহ আহত হন কমপক্ষে ২০ জন।

এছাড়াও সকাল সাড়ে আটটার দিকে কলেজ রোড থেকে বিএনপি মিছিল বের করার চেস্টা করার সময় পুলিশ দূর থেকে টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছুড়লে মিছিলকারীরা পালিয়ে যায়।পরে মিছিলে বাধা ও পুলিশী হামলার প্রতিবাদে মহানগর বিএনপি সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি নতুনবাজার এলাকায় সমাবেশ করেন।

এছাড়া বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ১৮ দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ