রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদটপঅন্তহীন সমস্যায় ভুগছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

অন্তহীন সমস্যায় ভুগছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

অন্তহীন সমস্যায় ভুগছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন । চেয়ারম্যান এবং সার্বক্ষণিক ও অবৈতনিক সদস্যের সাতটি পদ শূন্য এক মাসের বেশি ধরে। ৮৯ জনবল দরকার, ২৭ পদেই এই মুহূর্তে কেউ নেই। সরকার-নির্ধারিত বেতন আছে ঠিক, কিন্তু কর্মীদের জন্য নেই আর্থিক কোনো সুবিধা; ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তাও নেই।

কমিশনে দাখিল হওয়া অভিযোগের তদন্তের জন্য ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে কর্মীদের যাতায়াতের প্রয়োজনে পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা নেই। পর্যাপ্ত বাজেট নেই, নিজস্ব ভবন নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করতে আসা ভুক্তভোগীদের জন্য নেই মানসম্মত বিশ্রামাগার। শক্তিশালী ও তৎপর আইনজীবী প্যানেল নেই। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও নেই। ‘নেই আর নেই’ মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এমনই দশা।

বিধান অনুযায়ী ৪৬ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রতিকার বাতলে দেয় কমিশন। মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের অভিমত, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতন প্রভৃতি ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে এ দেশে। কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আগেও ছিল, এখনো আছে। শুরুর দিকে কয়েক বছর তৎপরতা ও উদ্যোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি একেবারেই যাচ্ছেতাই। প্রায় ১৪ বছর আগে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এর কারণ দুর্বল আইন এবং আমলানির্ভরতা। কমিশনকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দিয়ে তারা বলেন, ‘সংবিধান, আইন, আদালত, বিচার ও মানবাধিকার সম্পর্কে প্রখর ধারণা রাখেন এবং সাহসী ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন একজন চেয়ারম্যানকে দিয়ে মানবাধিকার কমিশন গঠন করা না হলে পরিস্থিতি সুখকর হবে না।’

নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও যথাযথভাবে নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী ১৪ বছর আগে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। আইন অনুযায়ী এটি একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা। তিন বছর পরপর কমিশন গঠন হয়। সরকারের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিযুক্ত হয়; এসব কাজে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক এবং সার্বক্ষণিক সদস্য হাইকোর্টের বিচারকের সমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকেন। তিন বছর মেয়াদ শেষে গত ২২ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান পদ থেকে বিদায় নেন সরকারের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব নাছিমা বেগম। তার বিদায়ে কমিশনের কার্যকারিতাও শেষ হয়ে যায়। তিনি সাবেক সচিব কাজী রিয়াজুল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।

২০১০ সালের ২৩ জুন থেকে ২০১৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। মানবাধিকারকর্মীদের অভিমত, তখন কমিশন সচল ও আলোচনায় ছিল। চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ না হওয়ায় এখন কমিশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ এলেও ভুক্তভোগীদের অপেক্ষার পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রতিকার দিতে পারছেন না দায়িত্বরতরা। নিয়োগের বিষয়ে জানতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

মানবাধিকারকর্মী ও ব্লাস্টের (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না হতাশকণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল ছিল এই মানবাধিকার কমিশন। এখন মানবাধিকারের ব্যাপারে সংস্থাটির ভূমিকা খুবই দৃষ্টিকটু। এর কার্যক্রম কেন গতিশীল হয়নি তার উত্তর সরকারই দিতে পারবে। বিগত কয়েক বছরে চেয়ারম্যান হিসেবে আমলারা দায়িত্ব পালন করেছেন। এই নিয়ে আমাদের ঘোর আপত্তি রয়েছে। আমাদের দাবি আইন, বিচার, আদালত ও মানবাধিকার বোঝেন এবং বিষয়টি ধারণ করেন এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হোক। তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’

জনবল সংকটে জটিলতা বাড়ছে : চারজন পরিচালকের দুটি পদ, জনসংযোগ কর্মকর্তার ১টি পদ, সহকারী পরিচালকের ১৯টি পদের ১৮টি, কম্পিউটার অপারেটরের ৯টি পদের ৪টি এবং লাইব্রেরিয়ানের ১টি পদসহ ২৬ পদে লোক নেই। কমিশনে কর্মরত দুজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘এখানে প্রেষণে সরকারি কর্মকর্তাদের যারা নিয়োগ পান তাদের বেতনভাতা ও অন্য আর্থিক সুবিধা সরকারিভাবে নির্ধারিত। আর যারা কমিশনের নিয়োগপ্রাপ্ত কাগজে-কলমে তাদের সরকারি বেতন হলেও পেনশন, গ্র্যাচুয়িটি, আবাসন বা অন্য আর্থিক সুবিধা নেই। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নেওয়া হয় চুক্তিতে। ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে যান। তখন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লোক খুঁজতে হয়। এতে কাজে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। এই নিয়ে কমিশনের নিজ উদ্যোগে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ রয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কমিশনের সার্বিক কাজে।

আর্থিক স্বাধীনতা নেই কমিশনের : বাজেট নিয়ে সরকারি বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীত চিত্র দেখা যায় মানবাধিকার কমিশনে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি অর্থবছরে কমিশনের যে বাজেট হয় তার বড় একটা অংশ খরচ না হয়ে ফেরত যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। খাতওয়ারি কমিশনের সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ভবন ভাড়ায়। কর্মীদের বেতন ও প্রচার-প্রকাশনায় খরচ হয় একটি অংশ। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছরে কমিশনের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভাড়া, কর্মীদের বেতন ও প্রচার-প্রকাশনায় খরচ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এক বছরে খরচ হয়েছে ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অব্যয়িত ৩ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ফেরত পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাজেট আসে কমিশনে। নাম না প্রকাশের শর্তে সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা  বলেন, ‘প্রতি অর্থবছরে যে বাজেট হয় তা অপ্রতুল। কোন খাতে কী পরিমাণ খরচ হবে তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কমিশনের কোনো আর্থিক স্বাধীনতা নেই।’ সংশ্লিষ্টদের অভিমত, ‘যদি একে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হয় তাহলে যে বাজেট হয় তার চেয়ে খরচ হবে কয়েকগুণ বেশি।’

এখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছেন সচিব (যুগ্ম সচিব) নারায়ণ চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘খরচের খাত না থাকলে টাকা ফেরত যাওয়াই স্বাভাবিক। এ নিয়ে আমরা উচ্চবাচ্য করি না। তিনি বলেন, ‘লোকবলের সংকট রয়েছে। চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে না। কমিশনের কার্যক্রম এই মুহূর্তে নেই বললেই চলে।

অভিযোগে শুধু চিঠি আর সুপারিশ : কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ধর্ষণ, পারিবারিক ও নারীর প্রতি সহিংসতা, নিখোঁজ, গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিনা বিচারে আটকের অভিযোগ আসে ৪৯৮টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৬৪টির। স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কমিশন ২০২১ সালের ১২ মাসে ৭৫টি অভিযোগের ৪৫টির নিষ্পত্তি করেছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৭১ শতাংশের কিছু বেশি।

এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট অভিযোগ এসেছে ৪৩০টি। এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬১টি অভিযোগের। কমিশনের হিসাবে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী বছরের জের, বছরওয়ারি গৃহীত অভিযোগসহ ১১ বছরে কমিশনে মোট অভিযোগ আসে ১১ হাজার ৮টি। বছরওয়ারি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ হাজার ২৩৯টি অভিযোগ। বছরওয়ারি অনিষ্পন্ন রয়েছে ৪ হাজার ৭৬৯ অভিযোগ। নিষ্পত্তি বলতে কমিশন যা বলে তার বেশিরভাগ আসলে চিঠি আর সুপারিশ। কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, লঘু অভিযোগে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি এবং আইনি সহায়তা দেওয়া হলেও তা সামান্যই। কমিশনে আসা অভিযোগের বড় একটি অংশ পুলিশ, র‌্যাব প্রভৃতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। আইনে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের কোনো ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়নি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় ও সুপারিশ করে।

কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে) ফারহানা সাঈদ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে চিঠি বা সুপারিশ পাঠালেও সে ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার অসংখ্য নজির রয়েছে। আইন পরিবর্তনের ব্যাপারে কয়েক বছর আগেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো জবাব আসেনি।’

এখনো ‘বি’ স্ট্যাটাসের তকমা : বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশন নিয়ে পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (জিএএনএইচআরআই) বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘বি’ স্ট্যাটাস দিয়েছে অনেক আগেই। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও প্যারিস নীতিমালার শর্ত পূরণে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে এ কমিশনের। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। ভারত, জর্ডান, কাতার, বাহরাইনের মতো দেশগুলো ‘এ’ স্ট্যাটাস পেলেও বাংলাদেশের এই কমিশন ওই সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান  বলেন, ‘স্ট্যাটাসের উন্নতি না হওয়ার একমাত্র কারণ কমিশনের আইনটি যুগোপযোগী নয়। আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা না থাকা। অন্যান্য ঘাটতি তো আছেই।

আসকের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘দেশে যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম ঘটনাবলি লক্ষ করছি তখন কমিশনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখছি না। ক্রসফায়ার, গুম নিয়ে যদি কমিশন সোচ্চার থাকত ও প্রশ্ন তুলত, সরকারকে নোটিস দিত তাহলেও কিছু স্বস্তি মিলত। আমাদের মনে হচ্ছে, এটি এখন অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কমিশনে অনেক অসংগতি ও ঘাটতি রয়েছে। তাদের চাকরি গতানুগতিক অন্যান্য চাকরির মতো। মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো ধারণ ও অভিযোগের প্রতিকারের জন্য যে মানসিকতা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা তো করতে হবে। যদি কমিশন বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা না যায় তাহলে রাষ্ট্র কিংবা কারও জন্য পরিস্থিতি ভালো হবে না। – দেশ রূপান্তর

আরও পড়ুন

সর্বশেষ