সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়এশিয়ার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর পুরস্কার গ্রহণ করলেন ড. আতিউর

এশিয়ার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর পুরস্কার গ্রহণ করলেন ড. আতিউর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ১১ অক্টোবর, রবিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫.০০ টায় (পেরুর স্থানীয় সময় ১০ অক্টোবর, শনিবার, সন্ধ্যা ৬.০০ টায়) লিমার শেরাটন হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সাময়িকী ‘দি ইমার্জিং মার্কেটস’ কর্তৃক প্রদত্ত ‘এশিয়ার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ২০১৫’ পুরস্কার গ্রহণ করেন। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক দায়বোধ সম্পন্ন ও সবুজ অর্থায়ন এবং টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. আতিউরকে এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। অনুষ্ঠানে ইমার্জিং মার্কেটস এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক  মি. টবি ফিলদেস ও গ্লোবাল ক্যাপিটালের ডেপুটি ডাইরেক্টর মিস্ রুদ বেড্ডোস ড. রহমানের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন।

মিস্ বেড্ডোস বলেন, গভর্নর রহমান গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ৬ শতাংশের ওপরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, উদ্ভাবনীমূলক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি যে তাঁর ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনকালে মূল স্টেকহোল্ডারদের অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত নীতির ওপর তাদের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছেন  Ñ এ পুরস্কার সেটিরই স্বীকৃতি বহন করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এই পুরস্কার বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও উদ্যমী উদ্যোক্তা, মুক্তিযুদ্ধের শহিদ এবং তাঁর সবসময়ের পরামর্শদাতা ও নির্দেশক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসর্গ করেছেন Ñ যাঁর অব্যাহত সমর্থনে বাংলাদেশ ব্যাংকে উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করার কারণেই তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম সারির নেতৃত্বে অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ অর্জন করে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন কার্যক্রমে নিরন্তর সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তাঁর সহকর্মীবৃন্দ এবং আর্থিক খাতের সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

পুরস্কার গ্রহণকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুদ্রা ও আর্থিক খাতের রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকে আস্থানির্ভর নীতি-অ্যাপ্রোচ গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ আমাকে ২০১৫ সালের জন্য ‘ইমার্জিং মার্কেটস এশিয়ার সেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর’ নির্বাচিত করা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থায়নসহ প্রকৃত অর্থনীতিতে পরিবেশবান্ধব টেকসই উৎপাদন কর্মকা-কে প্রাধান্য দিয়ে গৃহীত আমাদের ‘ডাউন টু আর্থ অ্যাপ্রোচ’ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকি মোকাবেলা করে ব্যাপকভিত্তিক আর্থসামাজিক অগ্রগতির ওপর জোর দিয়ে গৃহীত এই অভিযাত্রাকে আমরা অব্যাহত রেখে।


তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক গড় জিডিপি’র প্রায় দ্বিগুণ হারে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিচায়ক। একইসঙ্গে দেশে মূল্য স্থিতিশীলতা ও সামষ্ঠিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমছে এবং বহি:খাতের শক্তিশালী অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে ব্যাপকভিত্তিক টেকসই আর্থসামাজিক প্রবৃদ্ধির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থায়ন নীতিমালা গ্রহণের কারণে।

আজকের পুরস্কারের জন্য ইমার্জিং মার্কেটস এর সম্পাদক ও সকল স্টাফকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। একইসঙ্গে কিছু সাধারণ ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষাগুলো বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক কমিউনিটিতে আরও বেশি করে শেয়ার করার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। এছাড়া, যেখানে-যে দেশেই ইতিবাচক কোনো প্রচেষ্টার সূচনা হোক তা যথাশীঘ্র আমরা আমাদের মাঝেও প্রতিধ্বনিত ও অনুরণিত করতে চাই। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস্ আনেত্তি ডিক্সন বলেন, এ পুরস্কার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর ড. আতিউর রহমানের কাজের বিশাল স্বীকৃতি, যা আগামী বছরগুলোতে সহজ অর্থায়নে সহায়তা করবে। পেরুর অর্থমন্ত্রী মি. আলনসো সেগুরা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেন এবং সামনের বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দেন।
ড. রহমান ছাড়াও ভারত, পেরু, হাঙ্গেরি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইথিওপিয়ার অর্থমন্ত্রীগণ এবং মেক্সিকো, রাশিয়া, মিশর ও রুয়ান্ডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরগণ ইমার্জিং মার্কেটস এর পুরস্কার পান। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর রঘুরাম রাজন গত বছর (২০১৪) এই সম্মানজনক পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। তার আগের বছর (২০১৩) পান চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জো জিয়াওচাং।

উল্লেখ্য, এটি চলতি বছরে ড. আতিউরের পাওয়া দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মাননা। এর আগে জানুয়ারি মাসে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব দায়িত্বশীল অর্থায়নের কৌশল গ্রহণের জন্য লন্ডনভিত্তিক ‘দি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ এর সহযোগী অর্থবিষয়ক সাময়িকী ‘দি ব্যাংকার’ কর্তৃক এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ‘শ্রেষ্ঠ গভর্নর’ নির্বাচিত হন। তারও আগে গত বছরের নভেম্বরে দারিদ্র্য কমিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ গরিব মানুষের জন্য কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ ড. রহমান ফিলিপাইনের গুসি ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘গুসি শান্তি পুরস্কার’ এ ভূষিত হন। মানবিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ভারতের এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক ‘ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক ২০১১’ লাভ করেন। এছাড়া ড. আতিউর ২০০৯ সালের ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগদানের পর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনে অবদান রাখায় হংকং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মোস্ট ইনক্লুসিভ গভর্নর অব দি ওয়ার্ল্ড হিসেবে ‘সাটির্ফিকেট অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ২০১২’ পুরস্কার এবং গ্রিন ব্যাংকিং উদ্যোগের জন্য কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে ‘গ্রিন গভর্নর’ উপাধিসহ দেশে-বিদেশে আরও অর্ধডজন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।

  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ