চট্টগ্রাম দুই বছরেও কূল-কিনারা হয়নি আবদুল মালেক চৌধুরী জনি খুনের দুই বছরেও কূল-কিনারা হয়নি। গত মাসে সিআইডি মামলার এজাহারভুক্ত নয় আসামির মধ্যে ৫ জনকে বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এ নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মামলার বাদি। জনির ছোট ভাই ও মামলার বাদি আবদুল মাজেদ চৌধুরী রুবেল বলেন, ‘আমাকে না জানিয়ে পুলিশ চুপিসারে চার্জশিট দাখিল করেছে। আসামিদের সাথে পুলিশের সখ্য ছিল দাবি করে তিনি বলেন, খুনের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতা ফারুককে বাদ দিয়ে পুলিশ মামলার মোটিভ নষ্ট করে দিয়েছে। ৯ জনের মধ্যে প্রধান আসামিদের বাদ দেয়ার পর মামলা আর কী থাকল? তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকার পরও ছাত্রলীগের আহ্বায়ক খুনের সুষ্ঠু বিচার পাচ্ছি না। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে মামলার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছেন। তিনি বলেন, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছে, এমনকি নির্বাচনী প্রচারণাও চালিয়েছে- তবুও পুলিশ তাদের খুঁজে পায়নি। এর রহস্য কোথায়?
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে আন্দরকিল্লাস্থ দলীয় কার্যালয়ে দলীয় কর্মীদের হাতেই হামলার শিকার হন জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আবদুল মালেক জনি। ৪ দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে ৮ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। জনি খুনের পর তার ছোট ভাই আবদুল মাজেদ চৌধুরী রুবেল বাদি হয়ে নয়জনের নাম উল্লেখ করে নগরীর কোতোয়ালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিরা হলেন পটিয়ার মনসা এলাকার মৃত আনোয়ারের ছেলে আবু শাহাদত মো. সায়েম (৩০), বাঁশখালীর পালেগ্রাম এলাকার মৃত নুরুল আমিনের ছেলে ফরহাদুল আলম (২৮), পটিয়ার কুসুমপুরা এলাকার আবুল হাশেমের ছেলে মহিউদ্দিন মহি (২৯), বোয়ালখালীর আহলা এলাকার কামাল উদ্দিনের ছেলে আবু জাহেদ (২৬), পটিয়ার মনসা এলাকার আহমদ হোসেন প্রকাশ মাহাবুবের ছেলে মো. শামীম (২৭), পটিয়ার বিনিনিহারা এলাকার আবুল কাশেম প্রকাশ বুলুর ছেলে মনির উদ্দিন প্রকাশ ‘জঙ্গল মনির’ (৩২), লোহাগাড়ার বড় হাতিয়ার মালপুকুরিয়া ভবানীপুর এলাকার আবু সৈয়দের ছেলে কফিল উদ্দিন (২৬), বাঁশখালী পালেগ্রাম এলাকার মো. তৈয়বের ছেলে মো. দোবান প্রকাশ নোমান (২৪), পটিয়ার মোহাম্মদ নগর এলাকার মৃত কবির আহম্মদের ছেলে মো. ফারুক (৪২)। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু শাহাদত মো. সায়েম, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহবায়ক আ ন ম ফরহাদুল আলম, মহিউদ্দিন মহি ও আবু জাহেদকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।
অভিযোগপত্র : কোতোয়ালী থানায় দুই দফায় তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর মামলা তদন্তের জন্য যায় সিআইডিতে। গত ১৪ ডিসেম্বর মূখ্য মহানগর হাকিম মশিউর রহমান চৌধুরীর আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র পরিদর্শক আমিনুর রশিদ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে ৪৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে আট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এরা হলেন আবু শাহাদত মোহাম্মদ সায়েম, মহিউদ্দিন মহি, মোহাম্মদ শামীম, কফিল উদ্দিন প্রকাশ তৌহিদুল ইসলাম প্রকাশ কফিল। এ চারজন এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। অভিযোগপত্রে নতুন আসামি করা হয়েছে, আসাদ আল ফরহাদ, দেলোয়ার হোসেন, রমিজ উদ্দিন ও কামরুজ্জামান। তারা লোহাগাড়া ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
অভিযোগপত্র থেকে দ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এজাহারভুক্ত আসামি মোহাম্মদ ফারুকসহ ৫ জনকে। বাকিরা হলেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম ফরহাদুল আলম, মনির উদ্দিন প্রকাশ জঙ্গল মনির, মোহাম্মদ দোবান প্রকাশ নোমান, মোহাম্মদ আবু জাহেদ ও মোহাম্মদ ফারুককে। বাদিকে অবহিত না করে গোপনে এ অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে বলে দাবি করে আবদুল মাজেদ চৌধুরী রুবেল বলেন, দাখিল করা অভিযোগপত্রের উপর নারাজি আবেদন দিয়েছি। গতকাল বুধবার (৭ জানুয়ারি) নারাজি আবেদনের শুনানির দিন ধার্য্য ছিল। তবে অবরোধের কারণে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, খুনের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এজন্য আমি নারাজি আবেদন করেছি।
প্রকাশ্যে আসামিরা : খুনের ঘটনার পর ৫ আসামি উচ্চ আদালত থেকে ৪ সপ্তাহের জামিন নেয়। এরপর নিু আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আসামিরা নিু আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ না করায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আসামিরা প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং ও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এ সংক্রান্ত চিঠি পটিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী থানায় প্রেরণও করা হয়েছিল। পটিয়ায় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন ও নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশও নিয়েছেন কয়েকজন আসামি। বাঁশখালীতে একইভাবে প্রকাশ্যে ছিলেন আসামিরা। কিন্তু আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কাউকে খুঁজে পায়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদি, জনির পরিবার ও রাজনৈতিক সতীর্থরা। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও রাজনৈতিক চাপে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হলেও বিভিন্ন সময়ে আসামিরা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। জেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক সালাউদ্দিন সাকিব বলেন, জনি হত্যার পর টানা কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে অনেক নেতার বিরাগভাজন হয়েছি। চক্ষুশূল হয়েছি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীরকেও স্মরকলিপি দিয়েছিলাম। তাতেও মামলার অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে দলের মধ্যে ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, আগামীতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যারা আসবেন, তাদের জনি হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্থবির জেলা ছাত্রলীগ : ২০১১ সালের ১৯ এপ্রিল আবদুল মালেক চৌধুরী জনিকে আহ্বায়ক ও সালাউদ্দিন সাকিব, নুরুল আমিন, ফরহাদুল আলম, মহিউদ্দিন মহি, আবু জাহেদকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদ। কমিটি ঘোষণা পর থেকে ছয়জন দুই গ্র“পে বিভক্ত হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ দলীয় কমীদের হাতে খুন হন আহ্বায়ক আবদুল মালেক জনি। এরপর থেকে ছাত্রলীগের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। গত বছরের ৩১ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সমাবেশ থেকে ফেরার পথে লোহাগাড়া ছাত্রলীগনেতা তৌকির ইসলামকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের একাংশ। সেই হত্যা মামলারও কূল-কিনারা হয়নি। জেলা ছাত্রলীগের কোন্দলের দুটি লাশের পর ১ সেপ্টেম্বর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সভা ডেকে পদ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে বায়ো-ডাটা সংগ্রহ করেছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল। ১১৫জন পদ প্রত্যাশী সাক্ষাতকার ও সিভি জমা দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কমিটি আলোর মুখ দেখেনি। সাড়ে তিন বছর ধরে ছাত্রলীগের কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সংগঠনের গতিশীল ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে
পারিবারিক কর্মসূচি : আবদুল মালেক চৌধুরী জনি’র দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের বাড়ি আনোয়ারর কৈণপুরা গ্রামে আগামীকাল শুক্রবার সকালে খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।




