সবার জন্য ইসলামি ব্যাংকিং

প্রচলিত ব্যাংকে যেমন সব ধর্ম–বর্ণের মানুষ নির্বিশেষে সেবা নিতে পারেন তেমনি ইসলামি ধারার ব্যাংকও সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ আপনি মুসলিম নন, তাই ইসলামি ব্যাংক আপনার জন্য নয়—এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের সব ধর্মের নাগরিকই প্রতিটি ইসলামি ব্যাংকের সেবা নিতে পারেন।

দেশের ইসলামি ব্যাংকগুলোতে অমুসলিম কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। আর ইসলামি ব্যাংকের প্রতি সব মানুষের বিশ্বাসের কারণে এই সেবার দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ফলে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর কেউ কেউ ইসলামি হয়ে যাচ্ছে। এ সুযোগ যেসব ব্যাংক পায়নি সেগুলো শাখা ও উইন্ডো খোলার মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকগুলোর গ্রাহক ও অন্যান্য দেশের ইসলামি ব্যাংকগুলোর মতো নয়। যেমন, বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাহকই মুসলিম, অথচ মালয়েশিয়ায় কিনা ৭৫ শতাংশ গ্রাহকই অমুসলিম। সেটিও মুসলিমপ্রধান দেশ।

ইসলামি ব্যাংকগুলোতে যে ধরনের আমানত পণ্য রয়েছে, তা প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতোই। তবে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন বিনিয়োগ আপনার কাছে অস্পষ্ট মনে হতে পারে। কারণ, প্রতিটি বিনিয়োগ সেবার নাম আরবি শব্দে রাখা হয়েছে।

দেশে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের প্রথম অনুমোদন দেওয়া হয় ১৯৮৩ সালে। ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডও যাত্রা শুরু করে। দেখতে দেখতে দেশে এখন ইসলামি ধারার ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে ১০টিতে উন্নীত হয়েছে। বাকি ৯ ব্যাংক হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল), শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল) ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ও গ্লোবাল ইসলামী সম্প্রতি ইসলামি ধারায় রূপান্তরিত হয়েছে। আর ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক, যাদের যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৩ সালে।

এর বাইরে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৮টির ইসলামি শাখা আছে ১৯টি। আর ইসলামি ধারার ১০টি ব্যাংকের ১৭৮ শাখায় মিলছে ইসলামি ব্যাংকিং সেবা। শাখা ও উইন্ডো খুলে দিন দিন ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হচ্ছে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো। এভাবে গত বছরে ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হয় মার্কেন্টাইল, মিডল্যান্ড ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক।

বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের জমা টাকার ওপর ১৩ শতাংশ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে সংবিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) রাখতে হয়। আর ইসলামি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। প্রচলিত ধারার ব্যাংকের ইসলামি শাখা ও উইন্ডোগুলো এই সুবিধা পায়। সে জন্য ব্যাংকগুলো এদিকে ঝুঁকছে। আবার এই সেবার গ্রাহক চাহিদা বেশি, মুনাফার সুযোগও বেশি। তবে ইসলামি ব্যাংকিং সেবার আদর্শ ধারা মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ এখনো ২ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে।

ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণে মনোযোগ দিতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অনেকেই প্রচলিত ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে ইসলামি ব্যাংকে জমা রাখছেন বলেও শোনা যায়। আবার অনেকে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ইসলামি ব্যাংকের সেবায় ঝুঁকছেন। ইসলামি ব্যাংকগুলোর হজের টাকা, জাকাতের টাকা ও দেনমোহরের টাকা জমা রাখা—এসব পণ্য বেশ জনপ্রিয়।

তবে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বয়স ৩৮ বছর হলেও এখনো পৃথক আইন বা পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করা হয়নি। পাকিস্তানে ইসলামি ব্যাংকিং শুরু হয় ১৯৭৫ সালে, তারাও এ জন্য পৃথক আইন করেছে। কোনো পৃথক আইন বা পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা না থাকায় দেশের ব্যাংকগুলো তাদের ইসলামি ব্যাংকিং সেবার বিপরীতে নিজেদের ইচ্ছেমতো মাশুল নিতে পারছে এবং তা মুনাফায় যুক্ত করছে।

আবার গ্রাহকদের ওপর মাশুলের চাপ পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও শরিয়াহভিত্তিক পরিদর্শন ব্যবস্থা নেই। ইসলামি ব্যাংকগুলো তদারকির জন্য নেই পৃথক ব্যবস্থাও। আর ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনা ও তদারকির জন্য অভিজ্ঞ জনবলও দেশে নেই বললেই চলে। এ রকম ঘাটতির মধ্য দিয়েই দেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বড় হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক নীতিমালা চূড়ান্ত হচ্ছে। তা হয়ে গেলে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো তদারকির আওতায় আসবে।

About bdsomoy