ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞানমনষ্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দিনবদলের জন্য নিত্য নতুন লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলেই আমরা উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো।”
প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা প্রকল্পে বিশেষ অনুদান, ছাত্র/ছাত্রী ও গবেষকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ এবং এনএসটি ফেলোশিপের চেক প্রদান অনুষ্ঠানে এ আহবান জানান।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমির হোসেন। অনুষ্ঠানে ৭ জনকে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ ও ন্যাশনাল সায়েন্স টেকনোলজি চেক এবং তিনজনকে গবেষণা অনুদানের চেক প্রদান করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় অনুদান এবং বঙ্গবন্ধু ফেলোশীপের জন্য নির্বাচিত ফেলো ও বিজ্ঞানীগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকতে পারে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আগামী দিনে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করবে বলে তিনি তার বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক, দারিদ্র্যমুক্ত, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গবেষণা দেশের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। তিনি বলেন তার সরকার গবেষকদের মধ্যে যারা সুনির্দিষ্ট গবেষণায় নিয়োজিত, তাদের বয়সসীমা শিথিল করার চিন্তা ভাবনা করছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, বয়স যাতে গবেষকদের জন্য কোন বাধা হতে না পারে। তবে আমরা এটা গণহারে করতে চাইনা। যারা সুনির্দিষ্ট গবেষণায় নিয়োজিত আছেন- তাদের জন্য আমরা বিশেষ ব্যবস্থা করতে চাই।
শেখ হাসিনা বলেন, বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ অন সায়েন্স এন্ড আইসিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ও বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক তৈরিই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফেলোশিপের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদানের লক্ষে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। গত ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত ৭৮৪টি প্রকল্পের অনুকূলে ৩৭ কোটি ১৪ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৩১টি প্রকল্পের অনুকূলে ১২ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। দেশের সাধারণ নাগরিকদের দেয়া ট্যাক্সের অর্থ থেকে গবেষণা অনুদান এবং ফেলোশিপ প্রদান করা হচ্ছে।
এ সহায়তা আমাদের ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে যাতে সহায়ক হয় সে বিষয়ে গবেষক ও শিক্ষার্থীদেরকে সর্বোচ্চ শ্রম ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এ প্রসঙ্গে আমি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করতে চাই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা উন্নয়নে আমাদের জাতির পিতা সদ্যস্বাধীন দেশে যেভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন- সে পথ অনুসরণ করে আমাদের সরকারও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদানসহ সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা হবে।”
শিক্ষানবীশ গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের সরকারের বিগত শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত করেছি। ‘প্রযুক্তি বিভেদমুক্ত’ বাংলাদেশ গড়ায় অনন্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ২০২১ সালের অনেক আগেই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার সকল উদ্যোগ সম্পন্ন হয়েছে। মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় বিভিন্ন গবেষণাকর্মের উপর আন্তর্জাতিক জার্নালে ৪৪০টি এবং দেশীয় জার্নালে ৩৭৪টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ১৪টি পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে ১০ লক্ষের অধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় সম্ভব হয়েছে। প্রায় ২৮ হাজারটি খাদ্যদ্রব্যের নমুনায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরীক্ষা করে ৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। এক হাজার ১৪০ জনকে পরমাণু বিষয়ক উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারে পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত একটি তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে রাশিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে সচেতন ও নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উভয় দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করবে। বাংলাদেশ-মরক্কো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তিও আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের সময়ে স্বাক্ষর হয়েছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা তোষা ও দেশীপাটের জীনতত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন।
এছাড়াও জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে ‘মহাকাশ বিজ্ঞান গ্যালারি’ স্থাপন এবং ২৯টি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রদর্শনী বস্তু সংগৃহীত হয়েছে এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী মেধা বিকাশের লক্ষ্যে ১৬৯টি বিজ্ঞান ক্লাবকে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়েছে ।
বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থী গবেষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সরকারের সময়ে মোবাইল ফোনকে সাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করতে সুলভ মূল্যে গ্রাহক সেবা দানের ব্যবস্থা করি। কম্পিউটারের শুল্কহার হ্রাস করে এর মূল্য তিন ভাগের একভাগে নামিয়ে আনি। এর ফলে কম্পিউটার প্রযুক্তিকে সার্বজনীন করা সম্ভব হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারের তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি হাতে কলমে শিক্ষা দিতে কম্পিউটার প্রদান করি।
শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি পাঠদান পদ্ধতি সহজ ও আনন্দদায়ক করতে দেশব্যাপী ২০ হাজার ৫শ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ল্যান্ড টেলিফোনের চার্জ হ্রাস, দাপ্তরিক কর্মকান্ড ও অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা অন-লাইনে করে দেয়ায় মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সেবা গ্রহণকারীরাও প্রযুক্তির সংস্পর্শে এসে পুরাতন ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে ক্রমেই বিজ্ঞানমনষ্ক হতে পারছেন।
প্রধানমন্ত্রী আবারো দৃঢ়তার সাথে বলেন, তার সরকার বরাবরই বিজ্ঞান গবেষণা ও উদ্ভাবনে পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিজ্ঞানচর্চাবান্ধব নীতি প্রণয়নে সর্বোচ্চ আন্তরিক।




