সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নীলফামারী-১ আসনে ঘোষণা করা হয়েছে বিএনপির জোটের প্রার্থী। আসনটিতে জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতে এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েছেন।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নীলফামারী-১ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে আফেন্দীর নাম ঘোষণা করেন।
এদিকে প্রকৌলশী তুহিনের মনোনয়ন না পাওয়ার খবরে ডোমার ও ডিমলা উপজেলার বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ—তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনি ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শাহরিন ইসলাম তুহিন দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করেছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা তার পক্ষে ছিল। তাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় আমরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। ফলে এ সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে গেছে। আবার অনেকেই বলছেন—নীলফামারি-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে মনোনয়ন নিয়ে সৃষ্ট এ ক্ষোভ দ্রুত সমাধান না হলে নির্বাচনের সময় দলীয় সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ নিয়ে কথা হয় নীলফামারী জেলা বিএনপির এক প্রবীণ রাজনীতিকের। তিনি বলেন, নীলফামারী বিএনপিকে গড়ে তোলার পেছনে প্রকৌশলী তুহিনের ৩১ বছরের শ্রম ও ত্যাগ রয়েছে। অতএব তাকে মনোনয়নের বাইরে রাখা এটা সার্বিকভাবে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে জামায়াত অধ্যুষিত নীলফামারী আসনগুলো যে কোনো একটিতে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করতেই হবে। ফলে নীলফামারীর অন্য যে কোনো সংসদীয় আসনে হলেও তুহিনকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। এরমধ্যে নীলফামারী-২ (নীলফামারী সদর) আসনটিতে তাকে মনোনয়ন দিলে জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে। বাকি নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) ও নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনেও মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুধু জিয়া পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার শিকার হয়েছেন তুহিন। যার ফলে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। এমনকি তিনি নির্বাসিত থাকায় স্ত্রীর জানাজাতেও উপস্থিত থাকতে পারেননি।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডোমার উপজেলার কৃষক জাকিরুল ইসলাম বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় বসবাস করি। কিন্তু জোটের যাকে প্রার্থী করা হয়েছে, তাকে আমি চিনি না। তিনি কখনো আমাদের গ্রামে বা কৃষকদের খোঁজখবর নিতে এসেছেন—এমন কিছু দেখিনি। হঠাৎ করে একজন অচেনা প্রার্থী দিলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।”
দলীয় সূত্র বলছে, প্রকৌশলী তুহিন বিগত হাসিনা সরকারের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর একযুগের বেশি সময় নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফিরে ডোমার ও ডিমলা উপজেলার প্রতিটি এলাকায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। সভা-সমাবেশে মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোটের স্বার্থে নিজের জায়গা ছেড়ে দিলেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আবারও ত্যাগের নজির স্থাপন করল জিয়া পরিবার। শরিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে শেষ পর্যন্ত সরে যেতে হলো জিয়ার পরিবারের এ সদস্যকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন বলেন, “বহুদলীয় গণতন্ত্র ও দলের শরিকদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটাই আমার সিদ্ধান্ত। দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ, আমিও বিশ্বাস করি—‘ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’।”
উল্লেখ্য, এদিকে মনোনয়ন পেয়ে আফেন্দী বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন। তবে জোটের প্রার্থী হলেও তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইতে পারবেন না। তাকে নিজ দলের প্রতীক খেজুর গাছ মার্কা নিয়েই নির্বাচনে নামতে হবে।



