বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
প্রচ্ছদফিচারসালেহ আহমদ চৌধুরীঃ শিক্ষানুরাগী ও জনদরদী মানুষের প্রতিকৃতি

সালেহ আহমদ চৌধুরীঃ শিক্ষানুরাগী ও জনদরদী মানুষের প্রতিকৃতি

পৃথিবীতে কিছু মানুষ দেখা যায়, যারা খুব অল্প সময়েই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে ফেলেন। সাফল্যের বরপুত্র যেন তাদের জন্য নির্ধারিত থাকে। পটিয়া উপজেলার হুলাইন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুসা খান-এর বংশে জন্ম নেয়া মরহুম সালেহ আহমদ চৌধুরী ছিলেন সেরকম একজন ক্ষনজন্মা মানুষ। একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে নিজের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা ও অধ্যাবসায়ের ফলে ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠেছিলেন সালেহ আহমদ চৌধুরী।
বৃটিশ আমলে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের প্রাচুর্যতা যেমন ছিল না, তেমনি অভাবও ছিল না। আজকালের মত কেউ টাকা/সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্য স্বপ্নও দেখতো না এবং প্রতিযোগিতায়ও নামতো না। তাঁরা পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারলেই খুশি হতেন। সে সময়ে শিক্ষার হারও নগন্য ছিল। তাঁর পিতা আমিন শরীফ চৌধুরীর আর্থিক অবস্থাও তৎকালীন সময়ে গ্রামের অন্য দশজনের মতই খুব বেশি স্বচ্ছল ছিলো না।
আমিন শরীফ চৌধুরীর চার পুত্রের মধ্যে সালেহ আহমদ চৌধুরী ছিলেন সবার বড়। তাঁকে খুব অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথে নেমে পড়তে হয়। সেজন্য মাধ্যমিকেই তাঁকে লেখাপড়ার পাঠ চুকাতে হয় । কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিলো। নিজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও ছোট ভাই নুর মোহাম্মদ চৌধুরীকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ।
সালেহ আহমদ চৌধুরী প্রথম জীবনে চট্টগ্রাম শহরে প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। পরবর্তিতে সমুদ্র পথে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) হতে বিভিন্ন প্রকার পণ্য সামগ্রী এনে চট্টগ্রামে বিক্রি করা শুরু করেন। সে সময় গ্রামের আরও কয়েকজন তাঁর সাথে ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ভাগ্যদেবী বরাবরই তাঁর প্রতি সদয় ছিলো। ফলে গ্রামের অন্যরা খুব বেশি সুবিধা কর‍তে না পারলেও তিনি বার্মার সাথে ব্যবসায় লাভবান হোন। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি খাতুনগঞ্জের আমির মার্কেটে অফিস স্থাপন করে আমদানি রফতানি ব্যবসা শুরু করেন। এসময় তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী চট্টগ্রামের আরেক শিল্পপতি মরহুম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে ‘আনোয়ারা জুট মিলস লি.’ এর উদ্যোক্তা পরিচালক হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে পৃথক হয়ে তিনি পাকিস্তান সরকারের শেষ দিকে তিনি নিজে একটি ‘জুটমিল’ করার জন্য সরকারি অনুমোদন গ্রহণ করেন। যা ছিল পাকিস্তান সরকারের সর্বশেষ জুট মিল স্থাপনের অনুমোদন। জুটমিল স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানাধীন কদমরসুল এলাকায় জমি ক্রয় করে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেন। এরমধ্যে দেশে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় ৷ ‘৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন ইত্যাদিতে দেশ উত্তাল হয়ে পড়ে ।
৭১’র মুক্তিযুদ্ধের কারনে সব কিছু এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ‘জুট মিল’ স্থাপনের কর্মকাণ্ডও বন্ধ হয়। স্বাধীনতার পর প্রাইভেট সেক্টরে জুটমিল স্থাপনের অনুমোদন দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে দেশে স্থিতিশীলতা আসার পর তিনি জুট মিলের পরিবর্তে ‘জুট কার্পেট মিল’ স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। তখন দেশে মাত্র দুইটা সরকারি ‘জুট কার্পেট মিল’ স্থাপিত হয়েছে ( (ঢাকা-বাগদাদ ও ফোরাত- কর্নফুলি কার্পেট মিল)। এবং আশির দশকের শুরুতে তাঁর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়। তিনি পূর্বের স্থানেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘সালেহ কার্পেট মিলস লি. নামের আধুনিক কার্পেট মিল’ । এর ধারাবাহিকতায় তিনি পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সালেহ জুট মিল, সালেহ জরিনা রিরোলিং মিল, সালেহ জরিনা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড প্রভৃতি শিল্প কারখানা। মূলতঃ কার্পেট মিল তাঁকে অর্থনৈতিক ভাবে সফলতা দান করে।
ব্যবসায়িক সফলতা পেয়ে তিনি অর্থ অপচয় না করে আরও জনহিতকর কাজের প্রতি মনোনিবেশ করেছিলেন। পাকিস্তান শাসনামলে ব্যবসার শুরুতেই তিনি যখন আমদানি রফতানি ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন, তখনই তিনি বংশীয় ঐতিহাসিক ‘মুসা খান মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান’ সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকার জনহিতকর কাজের সাথে যুক্ত হোন। এরপর তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় (যে বিদ্যালয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন) মরহুম মকবুল আলী খান প্রতিষ্ঠিত ‘হুলাইন প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এর পুরাতন মাঠির ঘর ভেংগে নতুনভাবে দালান তৈরি করে দেন। গ্রামের জনসাধারণ তাঁকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁর পিতার নামে এই বিদ্যালয়ের নামকরণ করেন- ‘হুলাইন আমিন শরীফ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
পরবর্তিতে তিনি গ্রাম ও এলাকার উন্নয়নের জন্য একটি ‘বড় কিছু’ করার চিন্তার বিষয়টি এলাকার মানুষের সাথে আলোচনা করার প্রাক্কালে রেলওয়েতে চাকরিরত সমাজকর্মী জনাব (মরহুম) আহমেদ হোসেন খান ‘ হুলাইনে একটি কলেজ স্থাপনের’ পরামর্শ দেন । জনাব আহমদ হোসেন খানের এই প্রস্তাব তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন। সেই সুবাদে ছোট ভাই জনাব নূর মোহাম্মদ চৌধুরীসহ মিলে ১৯৬৯ সনে চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক সংলগ্ন এলাকায় তৎকালীন সময়ে সাড়ে ৫ একর জায়গা কিনে নিজ গ্রাম হুলাইনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হুলাইন সালেহ-নূর ডিগ্রি কলেজ’। এই কাজে তাঁকে গ্রামের অনেক মানুষ সাপোর্ট দিয়েছিলেন। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে শুধুমাত্র বোয়ালখালীতে ‘কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ’ ও পটিয়া সদরে ‘পটিয়া কলেজ’ ছাড়া অন্যকোন কলেজ ছিল না।
সালেহ আহমদ চৌধুরী শুধুমাত্র এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হোননি। তিনি পর্যায় ক্রমে আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং আর্থিক অনুদানও দিয়েছেন। তিনি ‘হুলাইন হযরত ইয়াসিন আউলিয়া জামে মসজিদ’ পূনঃনির্মান করেন। মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘হুলাইন হযরত ইয়াসিন আউলিয়া হামিদিয়া আবেদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা’ ও ‘জরিনা বেগম এতিমখানা’। তাঁর জনহিতকর কাজ ও আর্থিক সহায়তা শুধু নিজ গ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি লোহাগাড়া থানার চুনতি হযরত শাহ সাহেব কেবলার ওখানে নিজ খরচে সিরাতুন্নবী মাহফিলের মাঠের জন্য জমি ক্রয় করে মাঠটি মাহফিলের উপযুক্ত করে দেন এবং কুতুবদিয়াতে হযরত মালেক শাহ (রহঃ) এর জীবদ্দশায় সেখানে উন্নয়ন কাজের জন্য আর্থিক সহায়তা দেন।
তাঁর ছেলেমেয়েরাও জনহিতকর কাজের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য নির্ধারিত সরকারি শিশু সদন স্থাপনের জন্য হুলাইন গ্রামে দুই একর জায়গা দান করেন, সেই জমির উপরই ‘সরকারি শিশু সদন’ প্রতিষ্ঠা হয়। যেখানে ১০০ জন এতিম-অনাথ শিশু প্রতিপালিত হচ্ছে।
জনাব সালেহ আহমদ চৌধুরী ১৯৬৫ সনে পটিয়া থানার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, তখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান উদ্ভাবিত মৌলিক গণতন্ত্রের আদলে ইউপি নির্বাচন হতো ।
তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আহবানে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৯ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম ১১নির্বাচনী এলাকা পটিয়া হতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন । জাতীয় সংসদে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন পরবর্তিতে পূরন করেছিলেন- তাঁর সুযোগ্য ছেলে মরহুম শাহনেওয়াজ চৌধুরী মন্টু ও সুযোগ্য বড় জামাতা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী । শাহনেওয়াজ চৌধুরী মন্টু ১৯৯১’র নির্বাচনে পটিয়া হতে এবং বড় জামাতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বাঁশখালী হতে ১৯৭৯ সনে ‘জাতীয় সংসদ সদস্য’ নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সালেহ আহমদ চৌধুরী সাহেব প্রকৃত অর্থেই একজন দানশীল জনদরদি মানুষ ছিলেন। তাঁর দানের হাত ছিল অবারিত। এলাকার অস্বচ্ছল মানুষদের তিনি আর্থিক সহায়তা দিতেন। তিনি বেশ রুচিশীল ও সৌখিন মানুষও ছিলেন। তিনি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে চলাচল করতেন (যখন চট্টগ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র মার্সিডিজ বেঞ্জ ছিল)। তাঁর কাতালগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন বাড়িতে তখন সুইমিংপুল নির্মাণ করেছিলেন, সে সময় অনেকে সুইমিংপুলের বিষয়টি কল্পনাও করতো না।
২৬ মার্চ,১৯৮৬ সনে কুতুবদিয়াতে হযরত মালেক শাহ (রহঃ) দরবারে অবস্থানকালিন অবস্থায় হ্রিদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে এই জনদরদি মানুষটি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু কালে তিনি তিন পুত্র ও চার কন্যা রেখে গেছেন।
সালেহ আহমেদ চৌধুরী প্রকৃত অর্থে একজন সফল মানুষ ছিলেন। তিনি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষানুরাগী, দানবীর, দূরদর্শী, জনদরদি একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর মত বহু গুনে গুনান্বিত মানুষ এযুগে বিরল। তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছিলাম এক অসাধারণ আপনজন, আর দেশ হারিয়েছিল একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তাকে। আল্লাহ পাক মরহুম সালেহ আহমদ চৌধুরীকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন,এই প্রার্থনা করছি।

লেখক –

মুহাম্মদ মুসা খান, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।
আরও পড়ুন

সর্বশেষ