ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুই আসামি চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের সামনে এখন দেশে ফিরলেই ফাঁসি। তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা নেই। এ কথা জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। আদালতের ভাষায় তারা দুই জন ছিলেন একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার মাস্টারমাইন্ড ও চিফ এক্সিকিউটিভ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই জামায়াত নেতার আপিল আবেদন করার নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়েছে গত ৩ ডিসেম্বর। এর মধ্যে তাদের কেউই আপিল করেননি। ফলে ফাঁসিই চূড়ান্ত হয়ে গেলো এই দুই যুদ্ধাপরাধীর, বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। দীর্ঘ প্রবাস জীবন যাপনকারী এই দুই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে গত ৩ নভেম্বর তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ২১(৩) ধারা অনুসারে ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। গত ৩ ডিসেম্বর এ সময়সীমা শেষ হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দণ্ডের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তারা আপিল আবেদন করেননি। আর সেটি না করায় দণ্ড কার্যকর করা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন একটি বিশেষ আইন। এখন যদি তারা আত্মসমর্পণ করেনও, তারপরও লিমিটেশন আইন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কলঙ্কজনক, নৃশংসতম, মর্মান্তিক বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী ওই সময়কার দুই আলবদর নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিষয়ে রায়ে উল্লেখ করা হয়, প্রমাণিত ১১টি অভিযোগের সবগুলোতেই ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলো। আসামিরা পলাতক থাকায় তারা গ্রেফতার হওয়া বা আত্মসমর্পণ করার পর এ রায় কার্যকর করা হবে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, তাদের এ ঘৃণ্য অপরাধ শুধু এবং শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য। এ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড না দিলে এটা হবে বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, জামায়াত ও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মিশনটি আলবদর বাহিনী সম্পন্ন করে। রায়ে আদালত চৌধুরী মাঈনুদ্দিনকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং ‘অপারেশন ইনচার্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘চিফ এক্সকিউটিভ’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে বলা হয়, রায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী প্রসিকিউশন ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে রায়ের সার্টিফায়েড কপি দেওয়া হবে। আসামিপক্ষ রায়ের কপি পেতে চাইলে আগে এ মামলার দুই আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
আসামি চৌধুরী মাঈনুদ্দিন স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে দুইবার বাংলাদেশ সফর করেছেন।
পলাতক দুই আসামি
ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের বেজড়া ভাটরা (চিলেরপাড়) গ্রামের মৃত আজহার আলী খানের পুত্র আশরাফুজ্জামান খান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ফেনী জেলার দাগনভুঞার চানপুর চৌধুরী বাড়ি (জগতপুর ফালিজেরঘাট) গ্রামের মৃত দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর পুত্র চৌধুরী মাঈনুদ্দিন যুক্তরাজ্যে পালিয়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে চৌধুরী মাঈনুদ্দীন একাত্তরে ছিলেন পূর্বদেশ পত্রিকার সাংবাদিক। স্বাধীনতার পরে তিনি পাকিস্তান হয়ে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান। তিনি লন্ডনের টেন্টহাম মসজিদের চেয়ারম্যান।
তারা উভয়েই ছাত্রজীবন থেকে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারা এ সংগঠনের হাইকমান্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বাহিনী হিসেবে আলবদর বাহিনীতে রুপান্তরিত হয় ইসলামী ছাত্রসংঘ। স্বাধীনতার উষালগ্নে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা বাস্তবায়নে আলবদর বাহিনীর কিলিং স্কোয়াড গঠিত হয়। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ওই বাহিনীর ‘অপারেশন ইনচার্জ’ এবং আশরাফুজ্জামান খান ‘চিফ এক্সিকিউটর’ বা ‘প্রধান জল্লাদ’ ছিলেন।
১৮ বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট’৭৩ এর ৩/২ ধারা অনুসারে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যা ও গণহত্যা- এ ৫ ধরনের ১১টি মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার উষালগ্নে দেশকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যরা হাইকমান্ডের নির্দেশে সরাসরি আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রুপ দিতে একাত্তরের ডিসেম্বরে ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনীর কিলিং স্কোয়াড গড়ে তোলা হয়। অভিযুক্ত চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ওই বাহিনীর ‘অপারেশন ইনচার্জ’ এবং আশরাফুজ্জামান খান ‘চিফ এক্সিকিউটর’ বা ‘প্রধান জল্লাদ’ ছিলেন। এ দু’জন বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন শেষে হত্যা করে রায়েরবাজার ইটখোলা ও মিরপুর বধ্যভূমিতে মরদেহ ফেলে দেন।
রায়ে বলা হয়, আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দিনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে আলবদর হেডকোয়ার্টারের নির্যাতন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়। তারপর মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়।
এভাবে ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ জন শিক্ষক, ছয় জন সাংবাদিক ও দুই জন চিকিৎসক।
যে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার জন্য আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিন দায়ী হয়েছেন তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষকরা হচ্ছেন, অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. সিরাজুল হক খান, ডা. মো. মর্তুজা, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। শহীদ চিকিৎসকরা হচ্ছেন, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী ও বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. ফজলে রাব্বী। শহীদ সাংবাদিকরা হচ্ছেন, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, পিপিআইয়ের চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের চিফ রিপোর্টার আ ন ম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সংবাদদাতা ও পিপিআইয়ের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার নিজামউদ্দিন আহমেদ, শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন এবং দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার।




