মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়এরশাদকে নির্বাসনে, রওশন যাচ্ছেন নির্বাচনে!

এরশাদকে নির্বাসনে, রওশন যাচ্ছেন নির্বাচনে!

ষ্টাফ  রিপোর্টার  (বিডিসময়২৪ডটকম)

এবার নিজ দলেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন এসময়ের সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নিজের গড়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান থাকলেও তাকেই নির্বাসনে যেতে হতে পারে। তাকে মাইনাস করে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যেতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার স্ত্রী ও দলের সিনিয়র প্রেসিডয়াম সদস্য রওশন। পত্নী হয়েও স্বামীকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা চলছে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্ররোচনায়। মহাসচিব রুহুল আমিনকেও ওই দলে নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।জাপার বিশ্বস্তসূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ অনড় থাকলেও নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে আগামী ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার পত্নী রওশন। শনিবার তার (রওশন) বাসায় দীর্ঘ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দপ্তর সম্পাদক তাজুল ইসলাম।

দুপুরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদের বাসায় বৈঠক করেছেন লের প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, গোলাম কিবরিয়া টিপু ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ নূরে হাসনা লিলি চৌধুরী। তবে ওই বৈঠকে এরশাদের ভাই জিএম কাদের ও দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ছিলেন না।ওই বৈঠকেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সূত্র মতে, বারবার সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে নিজ দল ও সরকারের মধ্যে কঠিন চাপের মুখে পড়েছেন সেনা কর্মকর্তা থেকে রাজনৈতিক বনে যাওয়া স্বৈরশাসক খ্যাত এই বিতর্কিত সাবেক রাষ্ট্রপতি। যদিও আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে অনেকটাই সরকারের আস্থাভাজন হয়েছিলেন তিনি। এ কারণে আওয়ামী লীগের শীর্ষমহল থেকে শুরু করে শরিক জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও তাকে গণতান্ত্রিক নেতা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ ৯০-এ তার স্বৈরাচার সরকার পতনের পর বিচার চেয়ে তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করেছিলেন বামধারার এই রাজনীতিবিদি।কিন্তু এখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকা সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হচ্ছে চাপ। তিনি না গেলে তার পরিবর্তে পত্নী রওশনকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করে নির্বাচনে অংশ নিতে চলছে লবিং। ওই প্রলোভনে রওশনসহ জাপার অনেক শীর্ষ নেতা রাজী হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

বিশেষ করে, গত ১১ নভেম্বর এক বক্তৃতায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ বলেছিলেন,  ‘সব দলের অংশ গ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ থুতু দেবে। কিন্তু এর সাতদিন পর ১৮ নভেম্বর ভোল পাল্টে ফেলেন তিনি। বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনের দরকার হয়, তাই ‘নির্বাচনে না গেলে মানুষ আমাকে থুতু দেবে’।

এ বক্তব্যের পর নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভাতে জাতীয় পার্টি থেকে ছয়জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন ও উপদেষ্টা করা হয় একজনকে। তাঁর দাবি অনুযায়ী পছন্দের একাধিক মন্ত্রণালয়ও দেয়া হয় জাতীয় পার্টির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের। গত ২ ডিসেম্বর ৩০০ সংসদীয় আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচন করার জন্য এরশাদ নিজেও মনোনয়নপত্র জমা দেন।

কিন্তু এর একদিন পর হঠাৎ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ফের আলোচনায় আসেন এরশাদ। তিনি বলেন, আগে তিনি নির্বাচনে না যাওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা রক্ষা করতেই নির্বাচনে যাবেন না তিনি। এর ধারাবাহিকতায় ৪ নভেম্বর দলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগেরও নির্দেশ দেন।

আর এতেই দলের ভেতরে এবং সরকারের শীর্ষ মহল থেকে চাপ প্রয়োগ শুরু হয় তার উপরে। এজন্য কয়েকদিন ধরে তার বাসার আশপাশে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়। সেময় তাকে গেপ্তার করা হতে পারে এমন গুঞ্জন ওঠে। কিন্তু ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয় তাকে গ্রেপ্তার নয়, নিরাপত্তার জন্য পাহারা বসানো হয়েছে।

এরপর তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বারংবার যোগাঙোগ করেছে। দলের নেতা জিয়াউদ্দিন বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, স্ত্রী রওশন, ভাই জিএম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, সালমা ইসলাম এবং দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে দিয়ে তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে সরকার। বিন্তু তাতেও কোন লাভ না হওয়ায় অনেকটা কঠোর অবস্থানে যায় সরকার। তাকে নির্বাচনে আনতে প্রলোভনের পাশাপাশি বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করা হয়। তার বাসায় ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালকও কয়েকবার গিয়েছেন।

দলের নেতাকর্মীরা দাবি করছে, এরশাদকে নির্বাচনে নিতে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বন্ধু রাষ্ট্র, কূটনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেসব চেষ্টার পরও এরশাদ তার অবস্থানে অনড় থাকায় সর্বাশেষ গত ১২ ডিসেম্বর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব। যদিও তিনি অসুস্থ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে- এমন প্রচার চালাচ্ছেন র‌্যাব ও তার দলের কয়েক নেতা। অবশ্য তার বিশেষ সহকারীরা তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আটক করে হাসপাতালে বন্দি রাখা হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা অভিযোগ করছে। এমন অভিযোগের পর এরশাদের দেয়া এক বিশেষ বার্তাও সেই কথা পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।

এদিকে জাপার একটি সূত্র বলছে, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন রওশনের নেতৃত্বাধীন জাপার একাংশ। শুধু তাই নয় এরশাদকে মাইনাস করার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।এমনকি তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন রওশন এরশাদ ও আওয়ামী লীগ ঘেঁষা কয়েকজন সিনিয়র নেতা। এরশাদের আটক হওয়ার সাথেও তাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগে উঠেছে।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, এরশাদের আদেশ অনুযায়ী মধ্যম সারির নেতাদের অনেকেই প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলেও বেশ কিছু শীর্ষনেতা প্রত্যাহার করেননি। প্রায় ৭০টি আসনে জাপা নেতারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি বলে জানা গেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ময়মিনসিংহ-৪ আসনে রওশন এরশাদ, চট্টগ্রাম-৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৯ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কিশোরগঞ্জ-৩ মুজিবল হক চন্নু, ঢাকা-১ সালমা ইসলাম। এ কয়টি অসনে আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের মনোনয়পত্র প্রত্যাহার করে জাপাকে ছেড়ে দেন বলেও জানা গেছে।

বিশেষ করে, শুক্রবার দফায় দফায় বৈঠক হয় রওশনের এরশাদের গুলশানের বাসায়। প্রেসিডিয়াম সদস্যরা এসে সিরিজ বৈঠ করেছেন রওশনের সঙ্গে। তার মধ্যে- গোলাম হাবীব দুলাল, মুজিবল হক চুন্ন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশিদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম প্রমুখ। কিছুক্ষণ পরপর তারা রওশনের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরলেও কোনো কথা বলতে রাজি হননি তারা।

পরে দুপুর আড়াইটার দিকে মুজিবল হক চন্নু বলেন, আমরা ম্যাডামের (রওশন) সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি। আমাদের পার্টির পরবর্তী করণীয় তিনি ঠিক করবেন। আনুমানিক রাত ১০টার দিকে রওশনের বাসা থেকে বের হন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। সাংবাদিকরা কিছু বলার অনুরোধ করলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। গাড়িতে বসে তিনি শুধু বললেন, ম্যাডামের সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত।

 এরপর সন্ধ্যায় ৭টায় রওশনের বাসায় প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তার্জিতক বিষয়ক উপদেষ্টা গহওর রিজভী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমদ। তাদের সাথে দীর্ঘ সোয়া ঘন্টা বৈঠক করেন রওশন। এর আগে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন রওশন এরশাদ। সেখানে আসন ভাগাভাগি নিয়েও কথা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানায়। ৬১টি আসন জাপাকে ছেড়ে দেওযা হবে বলেও জানা গেছে।

অপরদিকে দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের শুক্রবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, এরশাদ তার নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় আছেন। তার নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্বাচনে গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ অবস্থায় দলে দুটি পক্ষের অবস্থান স্পষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এছাড়া লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে জাপার দুটি অংশ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ