মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুস সুবহানের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বুধবার । মঙ্গলবার রায় ঘোষণার এ দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল রায় দেবেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম । গত বছরের ৪ ডিসেম্বর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকালে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে সুবহানকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই রাতেই তাকে পাবনা কারাগারে নেওয়া হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আবদুস সুবহানকে আটক দেখানোর আদেশ চান আদালতের কাছে। ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয় সুবহানকে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের আবেদন আমলে নিয়ে সুবহানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুবহানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইন এ মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করেন। ওই দিনই তদন্ত সংস্থা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেন। তদন্তের স্বার্থে ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেফহোমে নিয়ে সুবহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। ১৫ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে ৮৬ পৃষ্ঠার ওই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন।
২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রসহ ৮ ধরনের ৯টি মানবতাবিরোধী অপরাধে সুবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর ও ২৪ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের বিপক্ষে ও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আসামিপক্ষে শুনানি করেন সুবহানের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান। অন্যদিকে ৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন। গত বছরের ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করেন। গত বছরের ১ এপ্রিল সুবহানের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।
গত বছরের ৭ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুই তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইনসহ রাষ্ট্রপক্ষের ৩১ জন সাক্ষী। তাদের মধ্যে অভিযোগভিত্তিক ঘটনার ২৭ সাক্ষী হলেন- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম, শহীদপুত্র মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মোল্লা, মো. আবু আসাদ, রুস্তম আলী, মো. ইসরাইল, কোরবান আলী, শহীদ জায়া জাহানারা বেগম, আশরাফ উদ্দিন মিয়া, মো. রিয়াজ উদ্দিন মন্ডল, সানোয়ারা খাতুন, মো. ফজলুর রহমান ফান্টু, আব্দুর রহমান সরদার, শহীদ পরিবারের সদস্য মো. আব্দুল মতিন, মোঃ আজিজুল সরদার, মমতাজ উদ্দিন মন্টু, আক্কাছ শেখ, শহীদপুত্র আলী রানা শেখ, আব্দুল আজিজ, নিজাম উদ্দিন খান, হোসেন সরদার, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদপুত্র মো. শহিদুল্লাহ শহিদ, এসএম সামছুল আলম, মো. খোরশেদ আলম, শহীদপুত্র মো. সামছুল আলম, আবদুল বাতেন, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মোঃ ফজলুল হক এবং এস কে শহীদুল্লাহ।
আর জব্দ তালিকার দুই সাক্ষী হচ্ছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার গ্রন্থাগারিক আনিসুর রহমান ও বাংলা একাডেমির সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাবউদ্দিন মিয়া। অন্যদিকে সুবহানের পক্ষে ৩ জন সাক্ষী সাফাই সাক্ষ্য দেবেন বলে ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করে দিলেও কোনো সাফাই সাক্ষী হাজির করেননি আসামিপক্ষ। গত বছরের ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ও ৪ ডিসেম্বর আট কার্যদিবসে সুবহানের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন। অন্যদিকে গত বছরের ১৭ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ও ৪ ডিসেম্বর ৯ কার্যদিবসে সুবহানের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী। এর মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
সমাপনী যুক্তিতর্কে প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ সুবহানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তার হাতে নির্যাতিত-ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন। তুরিন আফরোজ বলেন, আব্দুল কাদের মোল্লার আপিল মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, অপরাধী যে অপরাধ করেছেন তাতে তিনি কোনো ক্ষমা পেতে পারেন কি-না সেটাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। একজন অপরাধীর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের (ভিকটিম) ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীর শাস্তির বিষয়ে সমাজের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতে সমাজকে এ ধরণের অপরাধ সংঘটন থেকে বিরত রাখার বিষয়টিও যেন বিবেচনায় নেন।
তুরিন বলেন, এ অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্য কেবল একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া না। সমাজকে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটন করা থেকে নিরুৎসাহিত করা বা কিংবা বিরত রাখাও এর উদ্দেশ্য। তুরিন আফরোজ এ মামলায় প্রসিকিউশনের এক সাক্ষীর সাক্ষ্যের অংশ পড়ে শুনিয়ে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। একই সঙ্গে সুবহানের অপরাধের শিকার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের আছে কি-না ট্রাইব্যুনালের এমন প্রশ্নের জবাবে তুরিন আফরোজ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। এ সময় তিনি এর আগে আরো দু’টি মামলায় ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে সুবহানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি দাবি করে তার খালাস চান ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী।




