ত্যাগের অমর শিক্ষা ও মানুষে মানুষে বিভেদ ভুলে ব্যক্তি অন্তরের সব কালিমা ধুয়ে মুছে এক অমিয় ভ্রাতৃত্বের ঈদ উদযাপিত হয়েছে সারাদেশে। সোমবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। এদিন সকালে সারা দেশের ঈদগাহগুলোতে ও মসজিদে মসজিদে ঈদের নামজ আদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু। নামাজ শেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোলাকোলি ও পশু কোরবানি। নিজের পছন্দের পশুটিকে মহান আল্লাহর উদ্দেশে ত্যাগের মাধ্যমে কোরবানি করে, প্রতিটি মানুষের জীবনে ত্যাগের অমর শিক্ষাগ্রহণ। আর এ ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানুষে মানুষে এক হয়ে পথ চলার শপথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থায়ীকরণ।
ঘরে ঘরে ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত হচ্ছে মন। পাশাপাশি এ ঈদুল আজহা ভ্রাতৃত্বের যে অমিয় বন্ধন এনে দেয় তা থেকে শিক্ষা নিয়ে শান্তির সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশ গঠন। প্রতিবারের মতো এবারও দেশে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ত্যাগের মহিমায় উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে ঈদ। সকালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রথম জামায়াত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টায়। প্রথম জামায়াতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান। দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ও খুতবা শেষে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করা হয়। অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে কোরবানির নামাজ ও খুতবা শেষে মোনাজাতে বিশ্বের প্রত্যেক মুসলমানের হজ কবুল করার জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তোলা হয়।
এ সময় পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান মোনাজাতে বলেন, আল্লাহ বিশ্বের সব মুসলমানকে দয়া করো ও সবার হজ কবুল করে নাও। যে নিয়ত নিয়ে সবাই হজে গেছে তাদের সেই আশা পূরণ করে বাড়ি ফেরার তওফিক দান করো। সবার দোয়া কবুল করো। আমাদের বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন যারা কবরে ঘুমিয়ে আছেন, সবার গুনাহ মাফ করে দাও। রোগ-বালাই দূর করে সবাইকে সুস্থ করে দাও।
জাতীয় মসজিদের পাশাপাশি হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের প্রধান জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামায়াত তো অনুষ্ঠিত হয়েছেই। বাংলাদেশের ঈদগাহে ও মসজিদে মসজিদে এ রকম ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে নিজের পাপমোচন ও পরিবার-পরিজন, দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া চেয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন; কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে পবিত্র ইদুল আজহা উপলক্ষে সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী বাসভবন গণভবনে সর্বসাধারণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণও দেন। এ সময় তিনি বলেন, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। দেশবাসী ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করছে। যারা বাড়িতে যেতে চেয়েছেন, তারা নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছেছেন। সব জায়গায় সবাই নিরাপদে ঈদ আনন্দ উপভোগ করছে। দেশবাসীকে উদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে সবাইকে কোরবানির উৎসর্গের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অন্যদিকে সোমবার ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এছাড়া বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, সরকারের উচ্চ পদের কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার জনগণ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
এরআগে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন। এদিকে ঈদে সারা দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কালেমা ও ঈদ মোবারকখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র ও সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।
এদিন ঈদের নামাজ শেষে অনেকেই গিয়েছেন কবরস্থানে স্বজনের কবর জিয়ারতে। অশ্রুসিক্ত হয়ে চিরকালের জন্য চলে যাওয়া স্বজনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে করজোড়ে মোনাজাত করেন তারা। প্রতিবারের মতো এবারও দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। রাজধানীর হাইকোর্ট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদের নামাজ ও কোরবানি শেষে বিকেলে সাধারণ মানুষ কেউ প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়। আবার কেউ স্বজনদের বাড়িতে কোরবানির মাংস নিয়ে গেছেন। এছাড়া যারা সামর্থ অনুযায়ী কোরবানি দিয়েছেন তারা কোরবানি না দেওয়াদের মাঝে বিলিয়েছেন মাংস। রাজধানীতে শুক্রবার থেকেই ঢাকা ছেড়ে ঘরে ফেরার পালা শুরু হয়। এতে করে শনি ও রোববার শহরের সড়কগুলো ছিল প্রায় ফাঁকা। তবে ভিড় ছিল পশুর হাট, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে। ঈদের যাত্রায় ভোগান্তি কম ছিলনা। প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের আনন্দ, আপন ঠিকানায় ফেরার অনুভূতির তুলনায় যাত্রার দুর্ভোগ মেনে নিয়েই সপরিবারে গ্রামে গেছেন অনেক মানুষ। ধরে নেওয়া হচ্ছে ঈদের ছুটি কাটিয়ে বুধবার অথবা বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফেরা শুরু করবেন অনেকে। তবে আবার শুক্র ও শনিবারের ছুটি থাকায় পুরো দমে ঢাকা কর্ম-ব্যস্ত হতে রোববার পর্যন্ত সময় লাগবে।
প্রায় চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকেন। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী অনেকেই ঈদের পরদিন ও ঈদের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজেও (এবার মঙ্গল ও বুধবার) পশু কোরবানি করবেন।




