বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
প্রচ্ছদদেশজুড়েমগনামায় ১৫৯ কোটি টাকায় নতুন জেটিঘাট নির্মাণের উদ্যোগ

মগনামায় ১৫৯ কোটি টাকায় নতুন জেটিঘাট নির্মাণের উদ্যোগ

দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতা ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাতায়াতের অবসানে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামায় আধুনিক জেটিঘাট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান মগনামা জেটিঘাট সংস্কারেরও পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন জেটিঘাট নির্মাণ ও পুরোনো জেটি সংস্কারে সব মিলিয়ে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন জেটিঘাট নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে নকশা ও প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ার অনুমোদনের জন্য তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অনুমোদন ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা শেষে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত জেটিঘাটটির দৈর্ঘ্য হবে ২৪১ মিটার এবং প্রস্থ ১১ দশমিক ৩ মিটার। এতে প্রায় ২ হাজার ৪৩২ বর্গমিটার প্ল্যাটফর্ম রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মগনামা বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে জেটিঘাটটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্যোগ ও তদারকিতে এলজিইডির মাধ্যমে নতুন জেটিঘাট নির্মাণে ১৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রেখে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান পুরোনো মগনামা জেটিঘাট সংস্কারের জন্য ৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী রবিউল হোসাইন বলেন, নতুন জেটিঘাট নির্মাণে ১৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ার অনুমোদনের জন্য নকশা ও প্রাক্কলন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পেকুয়া–কুতুবদিয়ার নৌ যোগাযোগ আরও নিরাপদ ও আধুনিক হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মগনামা জেটিঘাট নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পর এটি কক্সবাজার জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় ঘাটটির বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিশিং বোটসহ বিভিন্ন নৌযান বাঁধার কারণে ঘাটের রেলিং ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিলার, রেলিং, পাটাতন ও নৌযানে ওঠানামার সিঁড়ির বিভিন্ন অংশও নষ্ট হয়ে গেছে। জোয়ার–ভাটার সময় এসব কারণে যাত্রীদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মগনামা জেটিঘাট দিয়ে প্রতিদিন অসুস্থ রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ পেকুয়া ও কুতুবদিয়ায় যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটটির জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করে নিরাপদ ও আধুনিক জেটিঘাট নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।

জেটিঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনার পর। গত ৬ সেপ্টেম্বর মগনামা জেটিঘাটে নৌযানে ওঠার সময় কুতুবদিয়া চ্যানেলে পড়ে শামীম (৩০) নামে এক যুবক নিখোঁজ হন। প্রায় সাড়ে ১৭ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর পুরোনো জেটিঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, নতুন জেটিঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে ঘাটটি যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি মৎস্য অবতরণ ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই নতুন জেটিঘাটে নিরাপদ ওঠানামা, পর্যাপ্ত আলো, রেলিং ও জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি মৎস্য অবতরণ ও পরিবহনের উপযোগী সুবিধা রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজু বলেন, মগনামা জেটিঘাট পেকুয়া ও কুতুবদিয়ার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা কমাতে প্রস্তাবিত আধুনিক জেটিঘাট দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঘাটটি বর্তমানে যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কুতুবদিয়ার জেলেরা এখানে মাছ এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। তাই নতুন জেটিঘাটের নকশায় যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি মৎস্য অবতরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

কঙবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–৩ এর পাবলিক প্রসিকিউটর ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মীর মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন টিটু বলেন, মগনামা জেটিঘাটটি কুতুবদিয়া উপজেলার মানুষের যোগাযোগ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন যথাযথ সংস্কার ও আধুনিকায়নের অভাবে ঘাটটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জেটিঘাট আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কুতুবদিয়াবাসীর জন্য আশাব্যঞ্জক। এটি বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় নৌযাতায়াতের পাশাপাশি পেকুয়া–কুতুবদিয়ার যোগাযোগ ও ব্যবসা–বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মগনামা জেটিঘাটের উন্নয়ন ও উপকূলীয় যোগাযোগব্যবস্থা নিরাপদ করার দাবি স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২১ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মগনামা জেটিঘাট ও সংলগ্ন উপকূলীয় বেড়িবাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি জেটিঘাট ও বেড়িবাঁধের টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এরপর নতুন জেটিঘাট নির্মাণ ও পুরোনো জেটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মগনামায় আধুনিক নৌ অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এতে পেকুয়া–কুতুবদিয়া নৌপথের যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি নৌ যোগাযোগ ও স্থানীয় ব্যবসা–বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, দরপত্র আহ্বান ও নির্মাণকাজ শুরুর সময়সীমা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ